প্রকাশ: বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১:৫৯ পিএম (ভিজিট : ১৬১)

X
বাংলাদেশ ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হলেও নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর শত্রু মুক্ত হয়েছিল ১৮ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন মহকুমা শহরটির সীমান্ত এলাকা ভারতের হিমকুমারী ক্যাম্প থেকে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী যৌথভাবে প্রবেশ করে শহরটি দখলমুক্ত করে। বিজয়ের এই আনন্দ ছড়িয়ে পড়লে মুক্তিপাগল হাজার হাজার মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আছড়ে পড়ে।
এদিন মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম কাজী ওমর আলীর নেতৃত্বে শহরে বিশাল আনন্দ মিছিল বের করা হয় এবং নেতৃবৃন্দ প্রথম সৈয়দপুর পৌরসভা ও আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।
সৈয়দপুরের যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের পর থেকেই। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা উপজেলার লক্ষণপুর ও রাণীরবন্দরের বিভিন্ন বাড়িতে গোপন বৈঠকের মাধ্যমে প্রতিরোধের প্রস্তুতি ও অস্ত্র সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেন। তবে সৈয়দপুর শহর অবাঙালি অধ্যুষিত হওয়ায় পরিস্থিতি ছিল বেশ উত্তপ্ত। ২৩ মার্চ রাতে লিবার্টি সিনেমা হলের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা শুরু হয়। এই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার বাঙালি শহর অবরোধ করে। সে সময় অবাঙালিদের গুলিবর্ষণে আলোকডিহি ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান অকুতোভয় মাহাতাব বেগ শহীদ হন, যা সৈয়দপুরে মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে গণ্য করা হয়। এদিন সকালেই ছাত্রলীগের উদ্যোগে শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের এই তৎপরতা সৈয়দপুর সেনানিবাসেও প্রভাব ফেলে। ২৪ মার্চ ভোরে সেনানিবাসে অবস্থানরত ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি ও পাঞ্জাবি সৈন্যদের মধ্যে মরণপণ যুদ্ধ শুরু হয়। সীমিত অস্ত্র নিয়ে বাঙালি সৈন্যরা বীরত্বের সাথে লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়। এরপর থেকে সেনানিবাস ও অবাঙালিরা মিলে শহরে বাঙালি নিধনযজ্ঞ শুরু করে। ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত চলা এই ভয়াবহ সহিংসতায় প্রায় ১০০ জন বাঙালি প্রাণ হারান। এরপর পাকিস্তানি সেনাদের নির্দেশে প্রায় ৭০০ বাঙালি পরিবারকে সৈয়দপুর হাইস্কুল ও দারুল উলুম মাদ্রাসায় স্থাপিত দুটি আশ্রয় শিবিরে বন্দি করে রাখা হয়। ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই শিবিরগুলোতে আটক থাকা মানুষদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন এবং সেখান থেকেও অন্তত ১২৫ জনকে হত্যা করা হয়।
সৈয়দপুরের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়টি রচিত হয় ১৩ জুন, যা 'গোলাহাট গণহত্যা' নামে পরিচিত। এদিন ভারতে পৌঁছে দেওয়ার নাম করে হিন্দু ও মাড়োয়াড়ি সম্প্রদায়ের কয়েকশ মানুষকে ট্রেনে তোলা হয়। ট্রেনটি শহরের উপকণ্ঠে ফাঁকা জায়গায় থামিয়ে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসরেরা ৩৩৮ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এর আগে ২৬ মার্চ রাতে প্রাদেশীয় পরিষদ সদস্য ডাঃ জিকরুল হকসহ ১৫০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ১২ এপ্রিল তাঁদের রংপুর সেনানিবাসের পাশে গুলি করে হত্যা করা হয়। দীর্ঘ ৯ মাসের এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে ১৮ ডিসেম্বর যখন যৌথবাহিনী শহরে ঢোকে, তখনও ডা. মোবারক আলীর মতো নিবেদিতপ্রাণ নেতাকে গ্রেনেড হামলায় প্রাণ দিতে হয়। বিভিন্ন সূত্রমতে, পুরো মুক্তিযুদ্ধে সৈয়দপুরের প্রায় ৬৫০ জন মানুষ শাহাদাতবরণ করেন।