
X
বরগুনার আমতলী উপজেলার সুবন্ধি খাল একসময় দক্ষিণাঞ্চলের অন্তত ৩০টি গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল। সেচ, মাছ আহরণ, নৌযান চলাচল থেকে শুরু করে দৈনন্দিন পানির চাহিদা-সবকিছুই নির্ভর করত এই খালকে কেন্দ্র করে।
কিন্তু খাল দখল, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং বছরের পর বছর কচুরিপানার চাপে সুবন্ধি খাল এখন প্রায় মৃতপ্রবাহে পরিণত হয়েছে। এর ফলে পানিবদ্ধতা, তীব্র দুর্গন্ধ, রোগবালাই ও পানিসংকটে খালের দুই পাড়ের প্রায় আড়াই লাখ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, চাওড়া খাল ও সুবন্ধি অংশ মিলিয়ে প্রায় ২৫ কিলোমিটারজুড়ে খালের অধিকাংশ স্থান কচুরিপানায় আচ্ছাদিত। অনেক জায়গায় বোঝার উপায় নেই এটি খাল, নাকি সবুজে ঢাকা কোনো জমি। বর্ষা মৌসুমে পানি নামার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমতলী পৌরসভার কয়েকটি ওয়ার্ডসহ সদর ইউনিয়নের ছুরিকাটা, মহিষডাঙ্গা, নাচনাপাড়া, আড়-য়া বৈরাগী, চলাভাঙ্গা এবং হলদিয়া ইউনিয়নের কাউনিয়া, রামজি, ঘুঘুমারি, লক্ষী ও রাওঘা-মোট অন্তত ৩০টি গ্রামের সড়ক ও বসতভিটা প্রায়ই পানিতে তলিয়ে যায়।
শুকনো মৌসুমে খালের পানি পচে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। এতে মশা-মাছির উপদ্রব বেড়ে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। পুকুর ও বিকল্প জলাধারের অভাবে বহু পরিবার বাধ্য হয়ে দূষিত পানি ব্যবহার করছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) একটি বাঁধ নির্মাণ করলেও সুবন্ধি অংশটি খোলা রাখা হয়েছিল, যাতে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি না হয়। তবে ২০০৯ সালে স্থানীয়দের আপত্তি উপেক্ষা করে ওই মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে চাওড়া ও সুবন্ধি খালের বিস্তীর্ণ এলাকার পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূল খাল ও শাখা খালগুলো মৃতপ্রবাহে পরিণত হয়ে কচুরিপানায় ভরে যায়।
এর প্রভাব পড়ে কৃষিখাতেও। সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বর্ষায় জমি প্লাবিত হয়, আবার শুকনো মৌসুমে দেখা দেয় তীব্র পানিসংকট। ২০২১ সালে কচুরিপানা অপসারণে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তিতে তা বাস্তবায়ন হয়নি।
খালের ওপর নির্মিত নিচু সেতু ও অপরিকল্পিত বিভিন্ন স্থাপনা পানিপ্রবাহকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। অনেক স্থানে সেতুর নিচে পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা না থাকায় বর্ষার স্রোতে খালের পাড় ধসে পড়ার ঘটনাও ঘটছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রকল্পের কথা শোনা গেলেও মাঠপর্যায়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। সুবন্ধি খাল শুধু একটি পানিপথ নয়; এটি তিনটি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষের জীবনমান, স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশ ও জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে পরিস্থিতি ভবিষ্যতে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল হান্নান প্রধান বলেন, “কয়েকটি সংযোগ খালের খননকাজ শুরু হয়েছে। সুবন্ধি খাল পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের অপেক্ষায় রয়েছে। পুনঃখনন, কচুরিপানা অপসারণ, দখল উচ্ছেদ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ভুলভাবে নির্মিত প্রতিবন্ধকতা অপসারণ ছাড়া এ এলাকার দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।”