ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এক পোশাকশ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা ও লাশ গাছে বেঁধে আগুন দেওয়ার ঘটনায় এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহত শ্রমিকের পরিবারের দাবি, কোম্পানির লোকজন ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে জনতার হাতে তুলে দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।
শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) বিলাপ করতে করতে নিহত দিপু চন্দ্র দাসের বোন চম্পা দাস বলেন, “কোম্পানির লোকজন চাইলে আমার ভাইকে জনতার হাতে না দিয়ে পুলিশের কাছে দিতে পারতো। তাহলে আমার ভাইয়ের এমন নির্মম মৃত্যু হতো না। ওরা জেনে–শুনেই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমার ভাই বিএ পাস, সে বাটন মোবাইল ব্যবহার করতো। ধর্ম নিয়ে তার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। নবীকে নিয়ে কটূক্তি করার মতো মানুষ সে নয়।”
চম্পা দাসের অভিযোগ, “উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে শ্রমিক ও মালিক পক্ষের সঙ্গে তার বিরোধ ছিল—এমন কথা শুনেছি। সেই কারণেই হয়তো মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশের হাতে দিলে আমার ভাই বেঁচে যেত।”
ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার রাতে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে বিক্ষুব্ধ জনতা ভালুকার জামিরদিয়া এলাকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কারখানার শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে তার মরদেহ গাছের ডালের সঙ্গে বেঁধে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
নিহত দিপু চন্দ্র দাস (২৫) ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা উপজেলার মোকামিয়া কান্দা গ্রামের রবি চন্দ্র দাসের ছেলে। তিনি গত দুই বছর ধরে ওই কারখানায় কর্মরত ছিলেন।
নিহতের বাবা রবি চন্দ্র দাস বলেন, “দিপুই ছিল আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম। কয়েক বছর আগে তার বিয়ে হয়েছে। আমার ছেলে যদি কোনো অন্যায় করেও থাকে, তাহলে তার হাত-পা ভেঙে হলেও পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া যেত। অন্তত প্রাণে বাঁচতো। এভাবে ছেলের মৃত্যু আমি কখনো কল্পনাও করিনি।”
নিহতের স্ত্রী মেঘনা রানী বলেন, “আমার একমাত্র সন্তান আজ বাবা হারা। অভাবের সংসারে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো বুঝতে পারছি না। এই হত্যার বিচার চাই—এটাই আমার একমাত্র দাবি।”
এ বিষয়ে পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে কারখানার গেটে গিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অনুমতি পাওয়া যায়নি।
তবে কারখানার সিকিউরিটি গার্ড ফিরোজ মিয়া বলেন, “দিপু চন্দ্র দাসকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি ক্ষমা চাননি। ফলে বিষয়টি কারখানার ভেতর ও বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন গেইটের সামনে জড়ো হয়ে ভাঙচুর শুরু করলে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তাকে জনতার হাতে তুলে দেয়।”
ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহেদুল ইসলাম বলেন, “এ ঘটনায় ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক প্রায় দুই ঘণ্টা অবরোধ করে রাখা হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অর্ধদগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।”
তিনি আরও বলেন, “শতশত মানুষের উপস্থিতির কারণে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। পরে প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়।”
পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে মামলা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।