
X
শেরপুর সদর উপজেলার সাতয়ানীপাড়া বৌবাজার এলাকার জীবন বিশ্বাসের স্ত্রী সুমিতা বিশ্বাস (২৮) এখন আদিবাসী নারীদের মাঝে রোলমডেল। হাতেকলমে কাজ শিখে ইলেক্ট্রিশিয়ান হিসেবে এখন তিনি প্রতিমাসে গড়ে ২০ হাজার টাকা উপার্জন করেন।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার ভটপুর গ্রামের আদিবাসী অবিলাশ বর্মনের ছেলে স্বপন বর্মন অভাবের কারণে এসএসসির গন্ডি পেরোতে পারেননি। ইলেকট্রনিক্স ট্রেড প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন গড়ে প্রতিমাসে তিনি ২৫ হাজার টাকা উপার্জন করছেন।
রাজশাহীর পবা উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের আদিবাসী যুবক সঞ্জয় বিশ্বাস (২৪) সেলুনের কাজের প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন গড়ে প্রতিমাসে দশ হাজার টাকা উপার্জন করছেন। আর শাহ মখদুম উপজেলার পবা নতুনপাড়া এলাকার আদিবাসী কালিপদ মিস্ত্রির ছেলে অনিল সর্দার (৩২) স্যানিটারির কাজ শিখে উপার্জন করছেন মাসে গড়ে ৩০ হাজার টাকা।
শুধু সুমিতা, স্বপন, সঞ্জয় বা অনিল নন; আরও অনেকেই এভাবে প্রশিক্ষণ নিয়ে সাবলম্বী হয়েছেন। পিছিয়ে পড়া এই আদিবাসীদের কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের পথ খুলে দিয়েছে ইনিস্টিটিউট ফর এনভায়রমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-আইইডি। বেসরকারি এই উন্নয়ন সংস্থাটি শেরপুর, রাজশাহী ও গাইবান্ধায় এ পর্যন্ত প্রায় তিনশ’ আদিবাসী নারী, পুরুষকে বছরব্যাপি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ এবং সহায়ক উপকরণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের পথ সৃষ্টি করে দিয়েছে।
আইইডি’র কো-অর্ডিনেটর ও জনউদ্যোগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সচিব তারিক হোসেন মিটুল জানান, পাহাড়ি-সমতলে আাদিবাসীদের ছোট সেই গ্রামগুলোতে এখন পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। কেউ ইলেকট্রিকের কাজ শিখছে, কেউ আবার মোটরসাইকেল ও ইঞ্জিন মেরামতের মতো টেকনিক্যাল কাজ শিখে জীবনে নতুন দিগন্ত খুলছে। প্রশিক্ষণ শেষে যখন তারা কাজে বের হয়, তখন শুধু টুলবক্স বা ব্যাগই বহন করে না; সঙ্গে বহন করে বদলে যাওয়ার সাহসটুকুও। আইইডি এই তিন জেলায় প্রায় তিনশ’ আদিবাসী নারী পুরুষকে বিভিন্ন ধরণের ট্রেডে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অটোমোবাইল, স্যানিটারি ও প্লাম্বিং, বিউটিফিকেশন ও পার্লার, দর্জি, সেলুন, ওয়েল্ডিং, ইলেক্ট্রিক ও ইলেক্ট্রনিক্স ইত্যাদি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বছরব্যাপি এই প্রশিক্ষণ নিয়ে এই আদিবাসী নারী পুরুষদের ৯৭ শতাংশই আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে সাবলম্বী হয়েছেন। এর পাশাপাশি কিশোরীদের হাতেকলমে আত্মরক্ষার কলাকৌশলও শেখানো হচ্ছে। এ পর্যন্ত যশোর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, নেত্রোকোনা, গাইবান্ধা, শেরপুর ও সুনামগঞ্জ জেলার আট শতাধিক কিশোরীকে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

আইইডি যশোরের ব্যবস্থাপক বীথিকা সরকার জানান, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কিশোরী ইভটিজিং বা যে কোনো ধরণের প্রতিকূল অবস্থায় নিজেকে রক্ষা করতে শেখে। পাশাপাশি তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হয়, তারাও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারবে।
শেরপুর সদর উপজেলার সাতয়ানীপাড়া বৌবাজার এলাকার জীবন বিশ্বাসের স্ত্রী সুমিতা বিশ্বাস জানান, এক সময় স্বামীর আয়ে সংসার চলতো না। সেই সময় আইইডি থেকে ইলেক্ট্রিক কাজের উপরে এক বছরের ট্রেনিং নিয়েছেন। প্রশিক্ষণ শেষে সাহস করে দোকান দিয়েছেন। এখন প্রতিমাসে গড়ে ২০ হাজার টাকা আয় করেন। গরম ও সেচ মৌসুমে দিনরাত কাজ করেন। তখন আয় ২৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
সুমিতা আরও জানান, একসময় জীবনে হতাশা ছিল। এখন আর হতাশা নেই। তাই লেখাপড়াও শিখতে চান। এজন্য উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছেন। এখন উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছেন। নিজের লেখাপড়া, সংসারের পাশাপাশি দুই ছেলের লেখাপড়াও চালাচ্ছেন তিনি। এখন তিনি তার সমাজে মাথা উঁচু করে চলেন।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার ভটপুর গ্রামের আদিবাসী অবিলাশ বর্মন দিনমজুর কৃষিশ্রমিক। অবিলাশের স্বপ্ন ছিল ছেলে স্বপন বর্মনকে লেখাপড়া শেখাবেন। কিন্তু দারিদ্র্য তাকে সে সুযোগ দেয়নি। তাই এসএসসি পরীক্ষার আগেই স্বপনকে স্কুল ছাড়তে হয়েছে। জীবিকার তাগিতে আইইডি উদ্যোগে স্বপন ইলেক্ট্রনিক্স ট্রেডে প্রশিক্ষণ নেন।
স্বপন বলেন, উপজেলায় বেশিরভাগ বিল্ডিংয়ের ওয়্যারিং, সিলিং, ফ্যান মেরামত, পানির পাম্প মেরামত এবং ফ্রিজ মেরামতের কন্ট্রাক্ট তার কাছেই বেশি আসে। কাজের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় অরবিন্দ বর্মন ও অন্তর বর্মন নামে দুজনকে যুক্ত করেন। তাদের আয় দেখে নয়ন বর্মন ও আব্দুল হামিদ নামে আরও নতুন দুজন যুক্ত হয়েছেন। এখন গরম মৌসুমে প্রতিমাসে ৩০ হাজার টাকা আয় হয় স্বপনের।
অন্যদিকে, রাজশাহীর শাহ মখদুম উপজেলার পবা নতুনপাড়া এলাকার আদিবাসী কালিপদ মিস্ত্রির ছেলে অনিল সর্দার জানান, স্যানিটারি ও প্লাম্বিং প্রশিক্ষণ নিয়ে তার জীবন বদলে গেছে। স্যানিটারির কাজ করে এখন মাসে গড়ে ৩০ হাজার টাকা উপার্জন করছেন।
শেরপুর জেলার আইইডি’র আইপি ফেলো সুমন্ত বর্মণ বলেন, ‘আমরা এই কার্যক্রমের মাধ্যমে শেরপুর জেলার সকল আদিবাসী ঝরে পড়া কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীদের বিকল্প আয়বর্ধকমূলক পেশার সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে এর ব্যাপক সাড়া পড়েছে। যারা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তারা সাবলম্বী হওয়ায় তাদের দেখে অনেকেই উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।
শেরপুর সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, আইইডি তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে ঝরে পড়া যুবকদের বিকল্প আয়বর্ধক পেশার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন পেশায় সংযুক্ত করার মাধ্যমে আইইডি তাদের আত্মনির্ভরশীল ও প্রতিষ্ঠিত করে তুলছে।