
X
নাচোল রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কেটলি আর খদ্দেরের ভিড়। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ চায়ের দোকান মনে হলেও, দোকানের ভেতরে তাকালে যে কারো চোখ আটকে যাবে।
নড়বড়ে বেড়ার তাকে সাজানো রয়েছে পুরোনো দিনের ট্রফি, মেডেল আর জরাজীর্ণ কিছু সনদপত্র। এই পুরস্কারগুলো কোনো শৌখিন সংগ্রাহকের নয়, বরং যিনি একহাতে চায়ের কাপ এগিয়ে দিচ্ছেন, সেই আব্দুল মান্নানের রক্ত-ঘামে অর্জিত স্মারক।
একসময় যার গ্লাভস পরা হাতের জাদুতে উল্লাসে ফেটে পড়ত স্টেডিয়ামের দর্শক, আজ সেই আব্দুল মান্নান জীবিকার তাগিদে বেছে নিয়েছেন চায়ের দোকানদারি।
মাঠ কাঁপানো ৭৫-এর সেই নায়ক আব্দুল মান্নানের ফুটবল অধ্যায়ের শুরুটা সেই ১৯৭৫ সালে। নাচোল রেলওয়ে স্টেশন শ্যামলী সংঘ ক্লাবের হয়ে গোলকিপারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ সময় ধরে গোলপোস্টের নিচে তিনি ছিলেন এক অতন্দ্র প্রহরী। প্রতিপক্ষের বাঘা বাঘা স্ট্রাইকারদের শট রুখে দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন দলের আস্থার প্রতীক।
তার ক্ষিপ্রতা আর সাহসিকতা একসময় মাঠ কাঁপিয়েছে, দর্শকদের বিমোহিত করেছে। কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই সব স্মৃতি আজ কেবলই ইতিহাস। ট্রফিই যখন নীরব সাক্ষী।
বর্তমানে আব্দুল মান্নান নাচোল রেলস্টেশন প্ল্যাটফর্মে নিজের তৈরি কুঁড়েঘরে বসবাস করেন। এই ঘরটিই একাধারে তার বাসস্থান এবং কর্মস্থল। দোকানের তাকে সাজিয়ে রাখা বিভিন্ন সময়ের খেলার পুরস্কারগুলো যেন তার সোনালী অতীতের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। প্রতিটি ট্রফির পেছনে জড়িয়ে আছে একেকটি বিজয়ের গল্প, যা এখন কেবল মান্নানের স্মৃতিতেই উজ্জ্বল।

দারিদ্র্য হার মানাতে পারেনি স্বপ্নকে। ফুটবল থেকে অবসর নিলেও ফুটবলকে মন থেকে বিদায় দিতে পারেননি তিনি। অভাবের সংসারে চা বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই দুই ছেলের লেখাপড়ার খরচ যোগান। শত কষ্টের মাঝেও তার স্বপ্ন তার সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করা।
তবে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই চরম দারিদ্র্যের মাঝেও ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা বিন্দুমাত্র কমেনি। নাচোল রেলস্টেশন সংলগ্ন মাঠে তিনি এখনো নিয়মিত খেলার আয়োজন করেন। নতুন প্রজন্মের মাঝে ফুটবলের নেশা ছড়িয়ে দেওয়া এবং খেলার মাঠ সচল রাখাটাই এখন তার একমাত্র শখ।
অবহেলার দীর্ঘশ্বাস জীবনের এতগুলো বছর খেলার মাঠে কাটিয়ে দিলেও, আব্দুল মান্নানের কপালে জুটেনি যথাযথ সম্মান। উপজেলা পর্যায়ে বা স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে এই কৃতি খেলোয়াড়ের কোনো কদর নেই। একসময়ের তারকা এই গোলকিপার আজ অনেকটাই নিভৃতচারী।
স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের মতে, আব্দুল মান্নানের মতো খেলোয়াড়রা দেশের সম্পদ। তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে না লাগিয়ে এবং তাদের যথাযথ সম্মান না দিয়ে আমরা মূলত আমাদের ক্রীড়া ইতিহাসকেই অবজ্ঞা করছি।
শেষ কথা আব্দুল মান্নান হয়তো আর গোলপোস্টের নিচে দাঁড়াবেন না, কিন্তু জীবনযুদ্ধে তিনি প্রতিদিন গোল ঠেকিয়ে যাচ্ছেন। চায়ের দোকানের ধোঁয়ায় তার দীর্ঘশ্বাস মিশে থাকলেও, চোখের কোণে এখনো ভাসে সেই উচ্ছ্বসিত গ্যালারি। কর্তৃপক্ষের সামান্য সুদৃষ্টি হয়তো মান্নানের এই সংগ্রামী জীবনের শেষ সময়টুকুতে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারত। তার এখন শখ নতুন প্রজন্মকে নিয়ে স্থানীয় মাঠে নিয়মিত খেলার আয়োজন করা।