
X
আদিকালে যে নারীরা কৃষি কাজের সূচনা করেছিল সেই নারীরা আজও সম্পৃক্ত আছে কৃষি কাজের সঙ্গে। কেবল কৃষি কাজই নয়, দিনের পর দিন বেড়েছে নারী শ্রমিকদের কর্মপরিধি। কিন্তু বাড়েনি তাদের পারিশ্রমিক। নানান অবহেলায়, পরনির্ভরশীল হয়ে বেঁচে না থেকে স্বাবলম্বী হয়ে বেঁচে থাকার তাগিদেই নারীরা বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
সারিয়াকান্দি এলাকার নারীরা কৃষি কাজের পাশাপাশি গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন (রাস্তাঘাট নির্মাণ), মরিচের চাতাল, ধানের চাতাল, হোটেল রেস্তোরাঁ, ইটের ভাটা এমনকি নির্মাণ শ্রমিকের কাজও করছেন। ঊর্ধ্ব মূল্যর বাজারে খেয়ে পরে বাঁচতেই বাধ্য হয়ে যুক্ত হচ্ছেন শ্রম বিক্রির সঙ্গে। কিন্তু এ শ্রম বিক্রি করতে গিয়ে তারা অবহেলার শিকার হচ্ছেন নানা রকমের। সেই সঙ্গে উপযুক্ত পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নারীরা।
বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি কৃষি নির্ভর একটি উপজেলা। এখানে তেমন কলকারখানা বা শিল্প প্রতিষ্ঠান নেই। কৃষি কাজই এই উপজেলার মানুষের একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম। এখানকার অধিকাংশ কৃষকেরই বসবাস দারিদ্র্যসীমার নিচে।
সরজমিনে চরাঞ্চলের কৃষি জমিতে গিয়ে দেখা যায়, যমুনার তপ্ত বালু ও উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ। সেখানে সকালের কড়া রোদে মরিচ তুলতে ব্যস্ত একদল নারী। বগুড়ার সারিয়াকান্দির যমুনা অধ্যুষিত চরাঞ্চলগুলোতে এখন এমন দৃশ্য নিত্যদিনের। এই উপজেলার ১১৭টি চরের নারীরা এখন পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কৃষিতে বিপ্লব ঘটাচ্ছেন। তাদের শ্রমেই মূলত সচল রয়েছে গ্রাম অর্থনীতির চাকা, ফিরছে পরিবারের স্বচ্ছলতা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানাযায়, সারিয়াকান্দির ১২টির মধ্যে ৬টি ইউনিয়ন মূলত যমুনা নদী বেষ্টিত। এসব দুর্গম চরের প্রধান জীবিকা কৃষি। আগে এসব এলাকায় কেবল পুরুষরাই মাঠে কাজ করতেন, কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন বীজতলা তৈরি, নিড়ানি দেওয়া থেকে শুরু করে ফসল তোলা ও মাড়াইয়ের কাজেও নারীরা সমানভাবে অংশ নিচ্ছেন।
কাজলা ইউনিয়নের ময়ুরেরচর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মরিচ খেত থেকে মরিচ তুলছেন লক্ষ্মী রানী, হেলেনা বেগম ও জুলেখা। আলাপকালে তারা জানান, সংসারের রান্নাবান্না ও আনুষঙ্গিক কাজ সেরে তারা দলবেঁধে মাঠে ছোটেন। দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যা আয় হয়, তা দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ ও সংসারের বাড়তি চাহিদা মেটান তারা।
তবে এই সফলতার গল্পের আড়ালে রয়েছে বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস। শাহিদা আক্তার ও জুলেখা খাতুন নামের দুই নারী শ্রমিক আক্ষেপ করে বলেন, আমরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরুষের সমান পরিশ্রম করি। কিন্তু পারিশ্রমিকের বেলায় পাই অর্ধেকেরও কম। পুরুষেরা যেখানে ৫০০-৬০০ টাকা মজুরি পান, সেখানে আমাদের দেওয়া হয় মাত্র ২০০ থেকে ২৬০ টাকা।
স্থানীয়রা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এডভোকেসি সভার মাধ্যমে নারীদের অধিকার নিয়ে সচেতন করার চেষ্টা করছে। তবে মাঠ পর্যায়ে মজুরি বৈষম্য দূর না হওয়ায় নারীদের প্রকৃত অবদান অনেক ক্ষেত্রে মূল্যায়িত হচ্ছে না। সচেতন মহলের মতে, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা গেলে চরাঞ্চলের নারীরা দেশের কৃষি উৎপাদনে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, নারীরা কৃষি কাজে অত্যন্ত যত্নশীল। কৃষি কাজের প্রায় ৬০ ভাগ কাজ তারাই করে থাকে। সারিয়াকান্দি কৃষি কাজে পুরুষ ও নারী শ্রমিকেরা সমান ভূমিকা রাখছেন।
তিনি আরও বলেন, সকল ধরনের ফসলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নারীদের হাতের ছোয়া থাকে ধান কাটা- মাড়াই , মরিচ তোলা ও শুকানো পেঁয়াজ, ভুট্টা ও সবজি চাষের কাজে পুরুষের চেয়ে নারীরা এগিয়ে। তাঁদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতে পুরুষ শ্রমিকসহ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। চরের অভাবী সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর কারিগর এই লড়াকু নারীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।