
X
গত ১৯ জানুয়ারি গনমাধ্যমে সুতা আমদানি ও বন্ড সুবিধা নিয়ে বিটিএমএ সভাপতির যে বক্তব্য ছাপা হয়েছে, তা বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তার এই বক্তব্যের সাথে বিজিএমইএ দ্বিমত পোষণ করে। এ বিষয়ে বিজিএমইএ এর মতামত নিম্নরূপঃ-
গত ১৯ জানুয়ারি বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো পরিসংখ্যানভিত্তিক, কাল্পনিক নয়।
প্রথমতঃ বিটিএমএ সভাপতি বলেছেন সংশ্লিষ্ট সবার সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত ০৮ জানুয়ারি ট্যারিফ কমিশনে একটি সভা হয়। সেই সভার আলোচনার সভার কার্যবিবরণী প্রকাশ হয় ১৩ জানুয়ারি। কিন্তু তার এক দিন আগেই, অর্থাৎ ১২ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বন্ধের জন্য এনবিআর’কে চিঠি দেয়। এর মানে হলো, আমাদের সাথে আলোচনার কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয়নি, সিদ্ধান্তটি আগে থেকেই নেওয়া ছিল।
দ্বিতীয়ত: প্রকাশিত সংবাদে বিটিএমএর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে যে, “বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কেবল ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা (এইচএস কোড ৫২০৫, ৫২০৬ ও ৫২০৭) বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ করেছে। এতে নতুন করে কোনো শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়নি এবং বর্তমানে সেফগার্ড ডিউটি আরোপেরও কোনো সিদ্ধান্ত নেই।” এই বক্তব্যটি বাস্তবতার আলোকে ব্যাখ্যার দাবি রাখে। বর্তমানে বাংলাদেশে সুতা আমদানির ক্ষেত্রে মোট আমদানি শুল্ক প্রায় ৩৯ শতাংশ। তবে রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের জন্য বিদ্যমান বিশেষ বন্ড সুবিধার কারণে এই সুতা শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা হয়। বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে কার্যত সেই ৩৯ শতাংশ কর আরোপ হয়ে যাবে, যা এখন শূন্য। সুতরাং “নতুন করে কোনো শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে না” বলা হলেও, বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের প্রস্তাব বাস্তবে শিল্পের ব্যয় কাঠামোর ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করবে।
তৃতীয়তঃ বিটিএমএ সভাপতি দাবি করেছেন যে, বন্ড সুবিধার সুফল কেবল বিদেশি ক্রেতারাই পায়, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নয়। মূলত গত কয়েক দশক ধরে বন্ড এবং ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধাই বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে আজকের বিশ্ববাজারে শক্তিশালী অবস্থান এনে দিয়েছে। এখন দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোর সুরক্ষার নামে সুতা আমদানিতে কৃত্রিম বাধা দেওয়া হলে ক্রেতারা অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নেবে অথবা সরাসরি বিদেশ থেকে Grey Fabric আমদানির নির্দেশ দেবে। এতে করে স্থানীয় সুতা শিল্পের সুরক্ষা হবে নাকি দেশের নিটিং ও কম্পোজিট মিলগুলোকে সংকটের দিকে ঠেলে দিবে?
চতুর্থতঃ সংবাদ প্রতিবেদনে বিটিএমএ সভাপতির উদ্ধৃতি অনুযায়ী প্রতিবেশী দেশগুলো নাকি প্রতি কেজি সুতায় প্রায় ৫০ সেন্ট ভর্তুকি প্রদান করে। অথচ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের এনবিআর-কে প্রেরিত পত্রের (অনুচ্ছেদ ২) তথ্যানুযায়ী, এই ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ৩০ সেন্ট প্রতি কেজি। নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই ধরনের তথ্যের গরমিল থাকা ঠিক নয়।
পঞ্চমতঃ বিটিএমএ সভাপতি এলডিসি উত্তরণের কথা বলেছেন। আমরা ব্যবসায়ী সম্প্রদায় তো বরাবর বলে আসছি, আমরা এখনও গ্র্যাজুয়েশনের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারি নাই, প্রস্তুতি নিচ্ছি- এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন অন্তত ৩ বছরের পিছিয়ে দেয়া হোক। আমাদের সাথে সাথে তিনিও কিছুদিন আগে একথা বলেছেন। তাছাড়া গ্র্যাজুয়েশনের পর রপ্তানি সুবিধা পেতে হলে দেশি সুতাই ব্যবহার করতে হবে, এটা সঠিক তথ্য নয়। নিয়ম হলো ‘ডাবল ট্রান্সফরমেশন’—অর্থাৎ সুতা থেকে কাপড় আর কাপড় থেকে পোশাক যদি দেশে তৈরি হয়, তবেই সুবিধা পাওয়া যাবে। বিদেশ থেকে সুতা এনে আমরা যদি দেশেই কাপড় আর পোশাক বানাই, তবেই অনায়াসে নিয়ম অনুযায়ী ৬০% মূল্য সংযোজন হয়। তাই সুতা আমদানির সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
উল্লেখ্য যে, গত ৪০ বছরে উদ্যোক্তা শ্রমিক ভাইবোনদের অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশের পোশাক শিল্প তিলে তিলে গড়ে উঠেছে। অনেক চড়াই উৎরাই অতিক্রম করে আমাদের পোশাক শিল্প আজ বিশ্ব বাজারে দ্বিতীয় অবস্থানে আসীন রয়েছে। এ শিল্পটি আজ অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। আমাদের একান্ত প্রত্যাশা, যে শিল্পটি দেশের ৪০ লক্ষ শ্রমিক ভাইবোনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, - ৫ কোটি মানুষের রুটি রুজির ব্যবস্থা পরোক্ষভাবে করেছে, সে শিল্পটি নিয়ে এমন কোন কথা কেউ দায়িত্বহীনভাবে বলবেন না, যা শিল্পের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে পারে। শিল্পকে এগিয়ে নিতে আমরা সকলের সহযোগিতা একান্তভাবে কামনা করি।