‘স্নেইল ফিভার’ বা শামুকজ্বর নিয়ে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, রোগটি যেভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে এটি নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন হতে পারে। প্রশ্ন উঠেছে, এই রোগ কীভাবে ছড়ায়?
মূলত ‘স্নেইল’ বা শামুকের মাধ্যমে ছড়ানো এক পরজীবীর সংক্রমণে ‘স্নেইল ফিভার’ (বৈজ্ঞানিক নাম: স্কিস্টোসোমিয়াসিস) হতে পারে। এর প্রভাবে মানুষের যৌনাঙ্গে ক্ষত, বন্ধ্যত্ব এবং এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
যে পরজীবীর কারণে স্নেইল ফিভার হয়, সেটির বাহক মূলত বিশেষ একধরনের শামুক। এই শামুক যে পানিতে থাকে, সেখানে পরজীবীর লার্ভা ছড়িয়ে পড়ে। কোনো মানুষ বা প্রাণী এই পানির সংস্পর্শে এলে লার্ভাগুলো ত্বকের ভেতর দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে।
শরীরে প্রবেশের পর লার্ভাগুলো ধীরে ধীরে পূর্ণবয়স্ক কৃমিতে পরিণত হয় এবং রক্তনালিতে বসবাস শুরু করে। স্ত্রী কৃমিগুলো ডিম পাড়ে। এই ডিমের কিছু অংশ মল বা প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। তবে অনেক ডিম শরীরের ভেতরেই আটকে যায়। পরে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা এই ডিমগুলো ধ্বংস করতে গিয়ে আশপাশের সুস্থ টিস্যুকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি হতে পারে। কিছু ডিম তলপেট ও যৌনাঙ্গের আশপাশে আটকে যায়। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘ইউরোজেনিটাল স্কিস্টোসোমিয়াসিস’। এই রোগে পেটব্যথা থেকে শুরু করে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।
স্নেইল ফিভার সাধারণত পরজীবীনাশক (অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক) ওষুধে সেরে যায়। তবে মালাউই লিভারপুল ওয়েলকাম ক্লিনিক্যাল রিসার্চ প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক জানেলিসা মুসায়াসহ অন্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরজীবীর নতুন কিছু ধরন পাওয়া গেছে, যেগুলো বর্তমানে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে ধরা নাও পড়তে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের শরীরে থাকা পরজীবী আর প্রাণীর শরীরে থাকা পরজীবী একে অপরের সঙ্গে মিলে নতুন এক ‘হাইব্রিড’ তৈরি করছে। এগুলো মানুষ ও প্রাণী উভয়কেই আক্রান্ত করতে পারে। ফলে রোগের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা দিন দিন কঠিন হচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, এই হাইব্রিড পরজীবীগুলো মানুষের যৌনাঙ্গেও সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। তবে এগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কারণ, এদের ডিম মাইক্রোস্কোপে সাধারণ পরজীবীর মতো দেখায় না। অনেক সময় স্বাস্থ্যকর্মীরা এর উপসর্গগুলোকে ভুলবশত সাধারণ যৌনবাহিত রোগ (এসটিডি) ভেবে বসতে পারেন। চিকিৎসা না হলে ইউরোজেনিটাল স্কিস্টোসোমিয়াসিস থেকে যৌনাঙ্গে ক্ষত, বন্ধ্যত্ব এবং এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে এই রোগের শারীরিক, সামাজিক ও সন্তান ধারণসংক্রান্ত প্রভাব আরও গুরুতর।
জলবায়ু পরিবর্তন, ভ্রমণ এবং অভিবাসনের কারণে স্নেইল ফিভার নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইতিমধ্যে দক্ষিণ ইউরোপের কিছু এলাকায় এমন হাইব্রিড সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্কিস্টোসোমিয়াসিস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রধান ডা. আমাদু গারবা জিরমে বলেন, এটা এখন বৈশ্বিক উদ্বেগ। কিছু দেশে মানুষের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ নেই, কিন্তু প্রাণীদের শরীরে পরজীবীটি রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে সেটাই মানুষের জন্য ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।