ইঁদুরের শরীর থেকে পুরোপুরি নির্মূল হলো অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার, বিজ্ঞানীদের বড় সাফল্য

স্বাস্থ্য ডেস্ক

স্বাস্থ্য

তিন ওষুধের সমন্বয়ে তৈরি ট্রিপল ড্রাগ থেরাপি ইঁদুরের শরীর থেকে অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার পুরোপুরি নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে। নতুন এই গবেষণা ক্যান্সার চিকিৎসায় আশার আলো দেখাচ্ছে।

2026-02-05T13:38:34+00:00
2026-02-05T13:38:34+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
ইঁদুরের শরীর থেকে নির্মূল হলো অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার
বড় সফলতা বিজ্ঞানীদের
স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১:৩৮ পিএম   (ভিজিট : ৮৯)
প্রতীকী ছবি
X

প্রতীকী ছবি

অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার (প্যানক্রিয়াটিস ক্যানসার) চিকিৎসায় তিন ওষুধের মিশ্রণে তৈরি ‘ট্রিপল ড্রাগ থেরাপি’ প্রাণীদের ওপর প্রাথমিক পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফলাফল দেখিয়েছে। 

এর মাধ্যমে ক্যান্সারের এই মারাত্মক ধরনটি মোকাবিলায় নতুন আশার আলো দেখছেন গবেষকরা। সাধারণত অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের বেঁচে থাকার হার অত্যন্ত কম।


সবচেয়ে প্রাণঘাতী ক্যান্সার একটি হিসেবে বিবেচিত এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের পাঁচ বছর বেঁচে থাকার হার মাত্র ১৩ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ, শনাক্ত হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। এমনকি রোগের একদম শেষ পর্যায়ে ধরা পড়লে বেঁচে থাকার এই সম্ভাবনা কমে মাত্র ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে। 

গত ২ ডিসেম্বর বিজ্ঞান সাময়িকী পিএনএএস-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় গবেষকরা নতুন এক সমন্বিত থেরাপির কথা জানিয়েছেন। এই পদ্ধতিতে ক্যানসার কোষ বৃদ্ধির তিনটি পথকে একসঙ্গে আটকে দেওয়া হয়, যা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় ইতিবাচক ফলাফল দেখিয়েছে।


গবেষকরা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘‘এই গবেষণা অগ্ন্যাশয়ের সবচেয়ে সাধারণ ধরন ‘প্যানক্রিয়াটিক ডাক্টাল অ্যাডেনোকার্সিনোমা’য় আক্রান্ত রোগীদের বেঁচে থাকার হার বাড়াতে নতুন সমন্বিত থেরাপি তৈরির পথ খুলে দিয়েছে। এই ফলাফলগুলো মূলত নতুন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরুর পথ নির্দেশ করছে।’’     

অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে পেটের ভেতরে কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ ছাড়াই নীরবে বাড়তে থাকে। ফলে রোগটি যখন শনাক্ত হয়, ততক্ষণে এটি শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা চিকিৎসকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।


সাধারণত প্রচলিত চিকিৎসা হিসেবে কেমোথেরাপি ব্যবহার করা হয়, যা শরীরের দ্রুত বিভাজিত হওয়া সব কোষের ওপর আক্রমণ চালায়। টিউমার নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে এই প্রক্রিয়ায় শরীরের সুস্থ কোষগুলোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। তবে এত কিছুর পরও টিউমারগুলো সাধারণত বিকল্প উপায়ে বংশবিস্তার শুরু করে এবং এক পর্যায়ে চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

নতুন এই থেরাপি ইঁদুরের শরীরে শুধু ক্যানসার ফিরে আসাই রোধ করেনি, বরং এটি সামগ্রিকভাবে প্রাণিটির জন্য সহনীয় ছিল। এমনকি এটি প্রয়োগে কোনো ধরনের দুর্বলতাজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা যায়নি।

অগ্ন্যাশয়ের প্রায় সব ধরনের ক্যানসারের সঙ্গে ‘কেআরএএস’ নামক একটি জিনের মিউটেশন বা রূপান্তরের সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণ অবস্থায় এই জিন কোষের বিভাজন ও বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। তবে জিনের গঠনগত পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটলে এটা সর্বদা সক্রিয় (অন) অবস্থায় থাকে। এর ফলে কোষের অস্বাভাবিক বিভাজন শুরু হয়, যা পরে ক্যানসারে রূপ নেয়।  

বর্তমান গবেষণার আগে, স্প্যানিশ ন্যাশনাল ক্যানসার রিসার্চ সেন্টারের (সিএনআইও) ক্যান্সার জীববিজ্ঞানী এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক কারমেন গুয়েরা একটি বিশেষ মাউস মডেল তৈরি করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি পরীক্ষা করেন যে, কীভাবে ‘কেআরএএস’ মিউটেশন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পথগুলো অগ্ন্যাশয়ের টিউমারকে টিকে থাকতে সাহায্য করে। গুয়েরা লাইভ সায়েন্সকে জানান, কেআরএএস-সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট কিছু পথ বন্ধ করে দেওয়া হলে ছোট টিউমারগুলোর বৃদ্ধি থেমে যায়। তবে বড় টিউমারগুলো প্রায়ই টিকে থাকার জন্য ভিন্ন কোনো বিকল্প পথ খুঁজে নেয়।

তাদের সর্বশেষ গবেষণায়, গুয়েরা এবং তার দল এই প্রতিরোধক্ষম টিউমারগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। সেখানে তারা দেখতে পান যে, যখন ক্যান্সার বৃদ্ধির অন্যান্য পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন এসটিএটি৩ (STAT3) নামক একটি প্রোটিন অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, প্রোটিনটি সম্ভবত টিউমার বৃদ্ধির জন্য একটি জরুরি ‘ব্যাকআপ’ পথ হিসেবে কাজ করছিল। 

গবেষক দলটি ইঁদুরের ক্যান্সার কোষে অন্যান্য প্রধান উদ্দীপকগুলোর পাশাপাশি এই পথটিও জেনেটিক্যালি বন্ধ করার চেষ্টা করেন। গুয়েরা জানান, এতে টিউমারগুলো সংকুচিত হতে দেখা যায়। এর মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ‘এসটিএটি৩’ মূলত চিকিৎসার বিরুদ্ধে টিউমারের প্রতিরোধ গড়ে তোলার একটি প্রধান কৌশল ছিল।

ওই পর্যায়ে গবেষকেরা নিশ্চিত হন যে, কেআরএএস, কেআরএএস-সংশ্লিষ্ট একটি পথ এবং এসটিএটি৩—এই তিনটি পথ জেনেটিক্যালি বন্ধ করতে পারলে টিউমার নির্মূল করা সম্ভব। এরপর তারা এই কৌশলটি ওষুধের মাধ্যমে প্রয়োগের পরীক্ষা শুরু করেন। 

তিনমুখী এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে আগে থেকেই প্রচলিত দুটি ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছে। এর একটি হলো ‘অ্যাফাটিনিব’, যা নির্দিষ্ট কিছু ফুসফুসের ক্যানসারের চিকিৎসায় মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) অনুমোদনপ্রাপ্ত। অন্যটি হলো ‘ড্যারাক্সনরাসব’, যা বর্তমানে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রয়েছে। তৃতীয় ওষুধটি মূলত একটি নতুন যৌগ, যা ‘এসটিএটি৩’ প্রোটিনকে অকেজো করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

গবেষক দলটি তিন ধরনের মাউস মডেলে এই ‘ট্রিপল ড্রাগ থেরাপি’র কার্যকারিতা মূল্যায়ন করেছেন। প্রথমটি ছিল ইঁদুরের অগ্ন্যাশয়ে সরাসরি টিউমার কোষ স্থাপন করে; দ্বিতীয়টি ছিল জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ইঁদুর, যাদের শরীরে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার তৈরি করা হয়েছে এবং তৃতীয়টি ছিল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন ইঁদুরের শরীরে মানুষের টিউমার টিস্যু স্থাপন করে (যাতে ইঁদুরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বাইরের টিস্যুকে আক্রমণ না করে)। এই তিনটি মডেলের সবকটিতেই ওষুধের এই মিশ্রণটি টিউমার পুরোপুরি নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে। 

গুয়েরা লাইভ সায়েন্সকে বলেন, ‘‘টিউমারটি ঠিক কোথায় ছিল, তা বোঝারও উপায় ছিল না। অগ্ন্যাশয়টি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছিল।’’

এই চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে ক্যানসার কোষের প্রতিরোধ ক্ষমতাও রুখে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। গবেষক দলটি জানিয়েছে, চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর অন্তত ২০০ দিন বা প্রায় সাত মাস পর্যন্ত টিউমারগুলো আর ফিরে আসেনি। সাধারণত এ ধরনের মাউস মডেলে একক ওষুধের থেরাপির মাধ্যমে যে ফল পাওয়া যায়, তার তুলনায় এটি অনেক দীর্ঘস্থায়ী ফলাফল। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিন ওষুধের এই সমন্বিত থেরাপি ইঁদুরের শরীরে কোনো বিষক্রিয়া বা গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। যেসব ইঁদুরকে এই থেরাপি দেওয়া হয়েছে, তাদের শরীরের ওজন, রক্তকণিকার পরিমাণ, বিপাকীয় সূচক এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা প্লাসিবো (নিষ্ক্রিয় ওষুধ) দেওয়া ইঁদুরের মতোই স্বাভাবিক ছিল।

তবে এই গবেষণা যেহেতু ইঁদুরের ওপর চালানো হয়েছে, তাই মানুষের ক্ষেত্রে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার চিকিৎসায় কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে। গুয়েরা উল্লেখ করেন, মানুষের তুলনায় ইঁদুর এ ধরনের বিষক্রিয়া মোকাবিলায় ‘বেশি সহনশীল’ হতে পারে। যদিও ইঁদুরের শরীরে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি, তবে ব্যবহৃত ওষুধগুলোর মধ্যে অ্যাফাটিনিব ইতিমধ্যে মানুষের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে এটি ত্বক ও পরিপাকতন্ত্রের কিছু সমস্যা তৈরি করে বলে জানা গেছে। 

গবেষকরা এখন একই পথগুলো (পাথওয়ে) লক্ষ্য করে কাজ করবে এমন বিকল্প এবং আরও উন্নত ওষুধ তৈরির ষ্টা করছেন বলে লাইভ সায়েন্সকে জানান গুয়েরা।


গুয়েরা আরও উল্লেখ করেন যে, অগ্ন্যাশয়ের টিউমারগুলোর জেনেটিক গঠন ভিন্ন ভিন্ন হয় এবং রোগীদের ক্ষেত্রে এতে অসংখ্য পরিবর্তন থাকতে পারে, যা প্রতিটি কেসকে একে অপরের থেকে আলাদা করে তোলে। সেই লক্ষ্যে গবেষক দলটি এখন অন্যান্য সাধারণ ‘কেআরএএস’ মিউটেশন এবং ক্যানসার-সংশ্লিষ্ট জিনের পরিবর্তন বহনকারী আরও কিছু মাউস মডেল নিয়ে গবেষণা করবে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের টিউমারের ওপর এই থেরাপির কার্যকারিতা যাচাই করা হবে বলে তিনি লাইভ সায়েন্সকে জানান।

সূত্র : লাইভ সায়েন্স। 




  বিষয়:   অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার  প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার চিকিৎসা  ট্রিপল ড্রাগ থেরাপি  ক্যান্সার গবেষণা  KRAS মিউটেশন  নতুন ক্যান্সার চিকিৎসা  মেডিকেল রিসার্চ  স্বাস্থ্য সংবাদ 



Loading...
Loading...


স্বাস্থ্য এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy