
X
১৯৯৭ সালের ৯ এপ্রিল। মালয়েশিয়ার কিলাত কেলাব মাঠে আইসিসি ট্রফির সেমিফাইনালে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখে বাংলাদেশ। সেই স্কটল্যান্ডই এবার সুযোগ পেল, আর দীর্ঘ ২৭ বছর পর কোনো বৈশ্বিক ক্রিকেট আসরে নেই বাংলাদেশ।
আজ থেকে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় শুরু হচ্ছে ২০ দলের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। ১৯৯৯ সাল থেকে সব ফরম্যাটের বিশ্বকাপে নিয়মিত অংশ নেওয়া বাংলাদেশ এবার নিজেই সরে দাঁড়িয়েছে এই মহাযজ্ঞ থেকে। ভারত ও আইসিসিকে কড়া বার্তা দিতে বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ সরকার। এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক টানাপোড়েন যে রাজনীতির মাঠ পেরিয়ে খেলার মাঠে এসে পড়েছে, তা নিয়ে রয়েছে নানা মত।
রাজনীতির ছায়ায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই দেশের কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর আগ্রহে ভাটা ফেলেছে। ক্রিকেটারদের মাঝেও যাতে বিশ্বকাপ খেলতে না পারার আক্ষেপ না থাকে, সে উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আয়োজন করেছে ‘অদম্য বাংলাদেশ টি-২০ কাপ’ নামে একটি বিশেষ টুর্নামেন্ট।
আড়াই কোটি টাকা প্রাইজমানির এই আসরে জাতীয় দলের তারকারা তিনটি দলে ভাগ হয়ে খেলছেন। শুক্রবার ছিল টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় দিন। শের-ই-বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামের বোর্ডরুমে বিসিবির এক পরিচালক এই টুর্নামেন্টের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেন, এটি অনেক ক্রিকেটারের জন্য বড় প্রাপ্তি বিশেষ করে তরুণদের নিজেদের প্রমাণের সুযোগ। যখন বিশ্বের ২০টি দেশ ব্যস্ত বিশ্বকাপের মঞ্চে, তখন দেশের ক্রিকেট কর্তারা অদম্য কাপের গুরুত্ব তুলে ধরতেই ব্যস্ত।
যেভাবে বদলে গেল দৃশ্যপট
অথচ এমন পরিস্থিতির কথা ছিল না। বিপিএল দিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে ছিলেন। হঠাৎ বদলে যায় সবকিছু। এর সূত্রপাত ভারতের বিতর্কিত এক সিদ্ধান্ত থেকে।
গত ১৬ ডিসেম্বর আইপিএলের নিলামে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে নেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স। আইপিএলে আগেও আট মৌসুমে ৬০ ম্যাচ খেলা মোস্তাফিজের জন্য এবার নিলামে ব্যাপক লড়াই হয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ভারতের হিন্দুত্ববাদী দলগুলোর প্রতিবাদের মুখে বিসিসিআইয়ের নির্দেশে তাকে দল থেকে বাদ দিতে বাধ্য হয় কলকাতা।
এই সিদ্ধান্ত ভালোভাবে নেয়নি বিসিবি ও বাংলাদেশ সরকার। প্রতিবাদ হিসেবে প্রথমে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার এবং পরে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়।
এরপর ৪ জানুয়ারি বিসিবি আইসিসিকে ই-মেইল পাঠিয়ে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানায়। চিঠি চালাচালি, ভার্চুয়াল বৈঠক, আইসিসির প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফর সবই হয়। এমনকি আইসিসির বোর্ড সভাতেও বিষয়টি তোলা হয়। তবে সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়।
আইসিসি জানিয়ে দেয়, বিশ্বকাপ শুরুর এক মাসের কিছু বেশি সময় আগে সূচি ঘোষণার পর ভেন্যু বা গ্রুপ পরিবর্তন সম্ভব নয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারা আরও বলে, আইসিসির মতো বৈশ্বিক সংস্থা সব দলের জন্য সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। আইপিএল একটি ঘরোয়া আসর, আর বিশ্বকাপ সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা।
সরকারের অনড় অবস্থান
আইসিসির আশ্বাস সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানে পরিবর্তন আসেনি। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং পরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জানান, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশ দল ভারতে বিশ্বকাপ খেলবে না। উপদেষ্টা পরিষদ ও খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলোচনার পরও একই সিদ্ধান্তে অটল থাকে সরকার।
শেষ পর্যন্ত আইসিসি বাংলাদেশের জায়গায় র্যাংকিংয়ের ১৪ নম্বরে থাকা স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত করে। আইসিসির সভায় বাংলাদেশ একমাত্র সমর্থন পায় পাকিস্তানের কাছ থেকে। যদিও পরে পাকিস্তানও তাদের অবস্থান শিথিল করে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলার ঘোষণা দেয়।
দর্শক হয়ে গেল বাংলাদেশ
সরকারি সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে বিশ্বকাপের দর্শকে। ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক তিক্ততা সরাসরি এসে পড়েছে ক্রিকেটে। এক পক্ষ এটিকে ভারত ও আইসিসির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান হিসেবে দেখলেও অন্য পক্ষ শঙ্কিত দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। সেই দেশকে ‘অনিরাপদ’ আখ্যা দিয়ে বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্তের পরিণতি কী হবে এ প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে ক্রিকেটাঙ্গনে। তবে এসব বিতর্ক থেকে দূরে রাখা হয়েছে ক্রিকেটারদের। তাদের এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে নিষেধ করা হয়েছে।
বিশ্বকাপ না খেলতে পারার আর্থিক ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে বিসিবি আয়োজন করেছে অদম্য বাংলাদেশ টি-২০ কাপ-যা বোর্ড কর্তাদের চোখে এক ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ টুর্নামেন্ট।