
X
রমজানের প্রস্তুতি বলতে আধুনিক সময়ে আমরা সাধারণত বাজারঘাট, ইফতারের আয়োজন কিংবা বাহ্যিক প্রস্তুতিকেই বুঝে থাকি। অথচ ইসলামের সোনালি যুগের মানুষ সালফে সালেহিনদের কাছে রমজান ছিল মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সর্বোচ্চ সুযোগ। তাই তাঁদের প্রস্তুতি সীমাবদ্ধ ছিল না জাগতিক ব্যবস্থাপনায়; বরং আত্মিক শুদ্ধতা, মানসিক দৃঢ়তা ও ইবাদতের গভীর প্রস্তুতিই ছিল তাঁদের মূল লক্ষ্য।
ছয় মাস আগে থেকেই রমজানের ব্যাকুলতা
সাহাবায়ে কেরামের জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রখ্যাত তাবেয়ি মুয়াল্লা বিন ফজল (রহ.) বলেন, সাহাবায়ে কেরাম বছরের ছয় মাস আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন যেন তিনি তাঁদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দেন। আর রমজান শেষে পরবর্তী পাঁচ মাস দোয়া করতেন, যেন তাঁদের আমল কবুল করা হয়। অর্থাৎ, তাঁদের পুরো বছরের চিন্তা ও সাধনা আবর্তিত হতো রমজানকে কেন্দ্র করে।
রাসুলুল্লাহ (স.) নিজেও রজব মাসের চাঁদ দেখলে দোয়া করতেন, “হে আল্লাহ! আমাদের রজব ও শাবান মাসে বরকত দিন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।” (বায়হাকি: ৩৫৩৪)
দিনক্ষণ গণনায় গুরুত্ব
রমজানের প্রতি গভীর আগ্রহ ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশ ছিল দিনক্ষণ হিসাব রাখা। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) শাবান মাসের দিন-তারিখের হিসাব অন্য যে কোনো মাসের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিয়ে রাখতেন (আবু দাউদ: ২৩২৫)। তিনি সাহাবিদের নির্দেশ দিতেন—“তোমরা রমজানের জন্য শাবানের চাঁদের হিসাব রাখো।” (সিলসিলাতুস সহিহাহ)
শাবান মাস: ইবাদতের প্রশিক্ষণকাল
সালাফদের কাছে শাবান মাস ছিল রমজানের ইবাদতের প্রস্তুতি ও মহড়ার সময়। বিশেষত কোরআন তেলাওয়াতের প্রস্তুতি তাঁরা শুরু করতেন এই মাস থেকেই। তাবেয়ি আমর বিন কাইস (রহ.) শাবান শুরু হলে ব্যবসা বন্ধ করে সম্পূর্ণ সময় কোরআনের জন্য বরাদ্দ দিতেন। তখন বলা হতো- “শাবান হলো তেলাওয়াতকারীদের মাস।”
আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) শাবান মাসে অন্য যেকোনো মাসের তুলনায় বেশি নফল রোজা রাখতেন (মুসলিম: ১১৫৬)। দীর্ঘ নামাজ ও সেজদার অভ্যাসের মাধ্যমে তাঁরা রমজানের দীর্ঘ ইবাদতকে আনন্দে রূপান্তর করতেন।
আত্মশুদ্ধি ও মাসায়েল শিক্ষা
গুনাহ মানুষের অন্তরকে কঠিন করে তোলে এবং ইবাদতের স্বাদ কমিয়ে দেয়। তাই সাহাবায়ে কেরাম রমজানের আগেই তওবা-ইস্তেগফারের মাধ্যমে নিজেদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতেন। পাশাপাশি তাঁরা রমজানের ফজিলত ও মাসায়েল নিয়ে আলোচনা করতেন।
রাসুলুল্লাহ (স.) সাহাবিদের রমজানের ফজিলত শুনিয়ে জান্নাতের ‘রাইয়ান’ দরজার সুসংবাদ দিতেন (বুখারি: ১৭৯৭), যাতে তাঁরা ইবাদতে আরও উদ্যমী হন।
দান-সদকা ও মানবিক প্রস্তুতি
রমজানে রাসুলুল্লাহ (স.) প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল হতেন। সাহাবিরাও এই সুন্নাহ অনুসরণ করে রমজানের আগেই দানের প্রস্তুতি নিতেন। জাকাত ফরজ হলে রমজানের আগেই তার হিসাব সম্পন্ন করাকে তাঁরা প্রজ্ঞার পরিচয় মনে করতেন।
রমজানের আগমনে স্বর্গীয় আনন্দ
মুমিনের জন্য আল্লাহর রহমত লাভের আনন্দের তুলনা নেই। কোরআনে বলা হয়েছে, “বলো, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়ায়, সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক।” (সুরা ইউনুস: ৫৮)
রাসুলুল্লাহ (স.) রমজানের আগমনে সাহাবিদের বলতেন- “তোমাদের দ্বারে বরকতময় মাস রমজান এসেছে।” (নাসায়ি: ২১০৬)
সালফে সালেহিনদের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদেরও কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি-
১. মানসিক সংকল্প: আসন্ন রমজানকে জীবনের সেরা রমজান বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া।
২. কাজা আদায়: আগের বছরের কাজা রোজা শাবানেই আদায় করা।
৩. কোরআনের সাথে সখ্য: এখন থেকেই নিয়মিত তেলাওয়াত শুরু করা।
৪. পরিবারকে সম্পৃক্ত করা: পরিবার নিয়ে রমজানের ফজিলত আলোচনা ও অপচয় বর্জনের অঙ্গীকার করা।
সাহাবিদের ইবাদতের ব্যাকুলতা যদি আমাদের অন্তরে সামান্য হলেও স্থান পায়, তবেই আমাদের সিয়াম সাধনা সার্থক হবে। বাজারঘাটের প্রস্তুতির চেয়ে আত্মিক প্রস্তুতিই মুমিনকে রমজানের প্রকৃত বরকত এনে দেয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রাসুলুল্লাহ (স.) ও সাহাবায়ে কেরামের পদাঙ্ক অনুসরণ করে রমজানের পূর্ণ বরকত লাভের তাওফিক দিন। আমিন।