
X
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) জাপানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাধারণ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই আকস্মিকভাবে এই নির্বাচনের ডাক দিয়েছেন।
গত বছরের অক্টোবরে দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে তিনি জাপানের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। স্বল্প সময় ক্ষমতায় থাকলেও তার জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে বেশ উঁচুতে অবস্থান করছে। এই জনসমর্থনকে কাজে লাগিয়ে সংসদের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে নিজের দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) আসনসংখ্যা বাড়াতে চাইছেন তাকাইচি।
কারা লড়ছেন নির্বাচনে
রোববারের নির্বাচনে সংসদের নিম্নকক্ষের সব ৪৬৫টি আসনের জন্য ভোটগ্রহণ হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে এক হাজার ২০০ জনের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রধান দলগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্ষমতাসীন এলডিপি, সদ্য গঠিত সেন্ট্রিস্ট রিফর্ম অ্যালায়েন্স, জাপান ইনোভেশন পার্টি, ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ফর দ্য পিপল, জাপানিজ কমিউনিস্ট পার্টি এবং কনজারভেটিভ পার্টি অব জাপান।
জাপানে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ। এর মধ্যে ৪৫ লাখের বেশি ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন।
ভোটের মূল ইস্যু কী
এ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় আলোচ্য বিষয় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। দেশে দ্রব্যমূল্য বাড়লেও প্রকৃত মজুরি সে হারে বাড়ছে না, ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। দীর্ঘদিন ধরেই ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জাপানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। গত বছর দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ। আগামী বছর এই হার আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উন্নত অর্থনীতির জন্য যেখানে ২ থেকে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে স্বাস্থ্যকর ধরা হয়, সেখানে এই চিত্র ভোটারদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলো ভিন্ন ভিন্ন সমাধানের প্রস্তাব দিচ্ছে। কেউ ভোগ্যপণ্যের ওপর কর কমানোর কথা বলছে, কেউ আয়কর সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। ক্ষমতাসীন এলডিপি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে, আর বিরোধী দলগুলোর একটি অংশ কল্যাণমূলক ব্যয় বাড়ানোর দাবি তুলছে। জাপান ইনোভেশন পার্টি বাজার উদারীকরণ ও নিয়ন্ত্রণ শিথিলের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে।
আরেকটি সংবেদনশীল ইস্যু হলো দ্রুত বার্ধক্যবর্ধন সমাজে বিদেশি শ্রমিকদের ভূমিকা। ২০২৫ সালে জাপানে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা ২৫ লাখ ছাড়িয়েছে। শ্রমবাজারের ঘাটতি পূরণে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন রক্ষণশীল ভোটারদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। এলডিপি নির্দিষ্ট খাতে শ্রমঘাটতি মেটাতে ‘নির্বাচিত অভিবাসন’-এর পক্ষে থাকলেও সামগ্রিকভাবে অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ি জোরদার করেছে।
কেন ঝুঁকিতে এলডিপি
এই নির্বাচন এলডিপির জন্য বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দলটি প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে জাপানের ক্ষমতায় থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে বড় ধাক্কা খেয়েছে। দলের একাধিক নেতা দীর্ঘদিন ধরে তহবিল অপব্যবহারের অভিযোগে আলোচনায় ছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সময় দলীয় কোন্দলও প্রকাশ্যে আসে। এক পর্যায়ে সংসদের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে হয় এলডিপিকে। বর্তমানে দলটি জাপান ইনোভেশন পার্টির সঙ্গে জোট সরকার পরিচালনা করছে।
এই প্রেক্ষাপটে দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হওয়া তাকাইচির জন্য এবারের ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এলডিপি বড় জয় পেলে তার নেতৃত্ব আরও শক্ত ভিত্তি পাবে।
তাকাইচির রাজনৈতিক এজেন্ডা
নিম্নকক্ষে শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে পারলে তাকাইচি অর্থনৈতিক সংস্কার ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে চান। তার অন্যতম উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য হলো জাপানের শান্তিবাদী সংবিধান সংশোধন, যা এখন পর্যন্ত কখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র জাপানের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং তাইওয়ান ভৌগোলিকভাবে জাপানের দ্বীপগুলোর খুব কাছাকাছি হওয়ায় বিষয়টি টোকিওর জন্য সংবেদনশীল। গত নভেম্বরে তিনি ইঙ্গিত দেন, তাইওয়ানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ হলে জাপান সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হতে পারে।
সব মিলিয়ে, এই আকস্মিক নির্বাচন কেবল সংসদের আসনসংখ্যাই নয়, বরং জাপানের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, নিরাপত্তা নীতি ও আঞ্চলিক কৌশলের দিকনির্দেশ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।