
X
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও উপদেষ্টার সমমর্যাদাসম্পন্ন বিশেষ সহকারী এবং সাবেক উপদেষ্টাদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী বা স্বামীদের সম্পদ, দায়-দেনা ও বিদেশে অবস্থিত সম্পদের পূর্ণাঙ্গ বিবরণী প্রকাশ করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ১ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে জারি করা নির্দেশনার আলোকে ৩০ জুন ২০২৪ ও ৩০ জুন ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত সম্পদের হিসাব জনস্বার্থে প্রকাশ করা হয়। মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ থেকে এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারি জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আর্থিক সম্পদ, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, ব্যাংক আমানত, বিনিয়োগ, ঋণ ও দায়ের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিদেশে অবস্থিত সম্পদ ও দায়ের হিসাবও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মোট সম্পদ ২০২৪ সালের ৩০ জুনে ছিল ১৪ কোটি ১ লাখ টাকা, যা ২০২৫ সালের ৩০ জুনে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৬২ লাখ টাকায়। সঞ্চয়পত্র নগদায়ন, ব্যাংক আমানত বৃদ্ধি, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ এবং বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকে আয়ের ফলে তার সম্পদের এই বৃদ্ধি হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক দায় রয়েছে প্রায় ২১ লাখ টাকা। তার স্ত্রী ড. আফরোজী ইউনূসের মোট সম্পদ একই সময়ে ২ কোটি ১১ লাখ টাকা থেকে কমে ১ কোটি ২৭ লাখ টাকায় নেমে এসেছে।
অর্থনীতি ও প্রশাসন সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের মধ্যে ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের মোট সম্পদ ২০২৪ সালে ৭ কোটি ১০ লাখ টাকা থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে ৭ কোটি ১৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তার স্ত্রী মিজ পারভীন আহমেদের সম্পদ ৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মোট সম্পদ এক বছরে ১৫ কোটি ৯ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১৬ কোটি ২২ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে আয়-চুক্তি, ব্যাংক আমানত ও মুনাফার কারণে তার সম্পদে এই বৃদ্ধি ঘটেছে। ড. আসিফ নজরুলের মোট সম্পদ ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে এবং তার স্ত্রী শীলা আহমেদের সম্পদ ২ কোটি ১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
প্রশাসন ও কূটনীতি বিষয়ক উপদেষ্টাদের মধ্যে জনাব মো. তৌহিদ হোসেনের মোট সম্পদ ২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২ কোটি ৯৩ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তার স্ত্রী জাহান আরা সিদ্দিকীর সম্পদ ৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা থেকে সামান্য কমে ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় নেমেছে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলমের মোট সম্পদ ২ কোটি ৬১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২ কোটি ৭৭ লাখ টাকায় পৌঁছেছে এবং তার স্ত্রী লায়লা আরজুর সম্পদ ১ কোটি ১১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১ কোটি ১৩ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। মানবাধিকার বিষয়ক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের মোট সম্পদ এক বছরে ৯৮ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২ কোটি ৫২ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত গৃহ ও কৃষি সম্পত্তির কারণে তার নন-ফাইনান্সিয়াল সম্পদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তার স্ত্রী ড. সায়রা রহমান খানের মোট সম্পদ ৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষা, আইন ও সমাজবিষয়ক উপদেষ্টাদের মধ্যে আলী ইমাম মজুমদারের মোট সম্পদ ৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরারের সম্পদ ৭ কোটি ২ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে এবং তার স্ত্রী তাসনিম আরেফা সিদ্দিকীর সম্পদ ৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৮ কোটি ২৯ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। ড. ফাওজুল কবির খানের মোট সম্পদ ৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৬ কোটি ৭২ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে এবং তার স্ত্রী দিলরুবা কবিরের সম্পদ ৩ কোটি ৭ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৩ কোটি ১৭ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের মোট সম্পদ ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা থেকে কমে ১ কোটি ১২ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীর সম্পদ সামান্য বেড়ে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সেনা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের মধ্যে বীর প্রতীক ফারুক ই আজমের সম্পদ ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২ কোটি ২ লাখ টাকায় পৌঁছেছে এবং তার স্ত্রী শামীমা ফারুকের সম্পদ ৩৬ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৩৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের মোট সম্পদ ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। তার স্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) রেহানা খানমের সম্পদ সামান্য কমে ৩৪ লাখ টাকা থেকে ৩৩ লাখ টাকায় নেমেছে।
নারী ও সমাজউন্নয়ন সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের মধ্যে নূরজাহান বেগমের মোট সম্পদ ৬ কোটি ২০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৬ কোটি ২৪ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তার স্বামী কে এম আসাদুজ্জামানের সম্পদ ২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা থেকে কমে ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। অধ্যাপক ড. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের মোট সম্পদ ৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে এবং তার স্ত্রী ড. রমা সাহার সম্পদ ৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফরিদা আখতারের মোট সম্পদ ৮১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১ কোটি ২ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে এবং তার স্বামী এফ. এম. মজহারুল হকের সম্পদ ১ কোটি ৬ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১ কোটি ১০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজের মোট সম্পদ ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাতিসংঘে চাকরিকালীন আয়ে কেনা বিদেশে অবস্থিত একটি ফ্ল্যাটের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তার স্ত্রী ঈশিতা সারওয়াত মিমের সম্পদ প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান নিজের ও স্ত্রীর নামে বিদেশে ৪৬ লাখ ৩৫ হাজার ৮৫০ মার্কিন ডলার সম্পদের তথ্য দিয়েছেন। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ঘোষিত দায় রয়েছে প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর মোট সম্পদ ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা থেকে সামান্য কমে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায় নেমেছে। তবে তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা থেকে ২ কোটি ৯৯ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। সাবেক উপদেষ্টাদের মধ্যে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার মোট সম্পদ দেখানো হয়েছে ১৫ লাখ টাকা এবং মো. মাহফুজ আলমের ১২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সার্বিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অধিকাংশ উপদেষ্টার সম্পদ গত এক বছরে গড়ে ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কয়েকজনের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ হ্রাস ও দায়-দেনা পরিশোধের কারণে সম্পদ কমেছে। বিদেশে সম্পদধারীদের তালিকায় রয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, ফারুক ই আজম এবং ড. খলিলুর রহমান। সরকার জানিয়েছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের সম্পদ বিবরণী নিয়মিত প্রকাশ করা হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব গ্রহণের দুই সপ্তাহের মাথায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার সরকারের সব উপদেষ্টার সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করা হবে।
তিনি বলেছিলেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে। আমাদের সব উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করবেন। পর্যায়ক্রমে এটি সব সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক করা হবে।