
X
সাধারনত মাথাব্যথা হয় ঘুম কম হওয়া, মানসিক দুশ্চিন্তা, কাজের চাপ, চোখের সমস্যা বা গ্যাস্ট্রিক বিভিন্ন কারণে। তাই প্রতিদিন মাথাব্যথা মানেই গুরুতর কিছু এমনটা নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে লাগাতার মাথাব্যথা চলতে থাকলে বা ব্যথার ধরন অস্বাভাবিক হলে তা বড় কোনো রোগের লক্ষণও হতে পারে। তেমনই ব্রেন টিউমারের একটি বড় লক্ষণ হলো এই মাথা ব্যথা। । নানা টোটকা কাজে লাগালেও কমে না সেই ব্যথা।
মানবশরীরে কিছু জিন আছে, যা টিউমার হওয়ার প্রক্রিয়াকে প্রতিরোধ করে। এদের বলে টিউমার সাপ্রেসর জিন। কোনো কারণে টিউমার সাপ্রেসর জিন যদি যথাযথ কাজ না করে, তাহলে ব্রেন টিউমার হয়ে থাকে। ব্রেন টিউমারের প্রাথমিক লক্ষণ মাথাব্যথা ও চোখে ঝাপসা দেখা। তবে মাথাব্যথা মানেই ব্রেন টিউমার নয়। সাধারণত মাথাব্যথার ১ শতাংশেরও কম কারণ হলো ব্রেন টিউমার। ব্রেন টিউমারের জন্য যে মাথাব্যথা হয়, তা সাধারণত খুব ভোরে শুরু হয়। সঙ্গে খিঁচুনি হতে পারে। খিঁচুনি সাধারণত হাতে বা পায়ে বা অন্য কোনো স্থান থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এই মাথাব্যথা কিছুতেই যেতে চায় না। মস্তিষ্কের ভেতর পিটুইটারি গ্ল্যান্ডে টিউমার হলে রোগীর দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। রোগী সামনের অংশটুকু ভালো দেখতে পেলেও দুপাশে দেখতে পান না এবং একপর্যায়ে অন্ধ হয়ে যান। ব্রেনের সামনের অংশে বা ফ্রন্টাল লোবে টিউমার হলে রোগীর স্মৃতিশক্তি কমে যায়। তিনি অস্বাভাবিক আচরণ করেন। দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। মটর এরিয়ায় টিউমার হলে যেদিকে টিউমার তার উল্টো দিকে প্যারালাইসিস হয়ে থাকে। মস্তিষ্কের খুলির নিচের প্রকোষ্ঠে টিউমার হলে রোগী হাঁটতে গেলে পড়ে যান বা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। কানে ঠিকমতো শোনেন না। কথা স্পষ্ট করে বলতে পারেন না। টিউমার বেশি বড় হয়ে গেলে রোগীর হঠাৎ মৃত্যুও হতে পারে।
টেনটোরিয়াম নামক একটি পর্দা দিয়ে আমাদের ব্রেন বা মস্তিষ্ক দুটি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত ওপরের প্রকোষ্ঠ ও নিচের প্রকোষ্ঠ। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ওপরের প্রকোষ্ঠে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ টিউমার হতে পারে এবং নিচেরটিতে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। আর শিশুদের ক্ষেত্রে ওপরের প্রকোষ্ঠে ৪০ শতাংশ এবং নিচেরটিতে ৬০ শতাংশ টিউমার হতে পারে।
ব্রেন টিউমার প্রধানত দুই ধরনের:
১. বেনাইন টিউমার, যা ক্যানসার নয় এবং
২. ম্যালিগন্যান্ট টিউমার বা ক্যানসার জাতীয় টিউমার।
ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যানসার জাতীয় টিউমার আবার দুই ধরনের:
১. প্রাথমিক ম্যালিগন্যান্ট, যা মস্তিষ্কের মধ্য থেকে উৎপত্তি হয়ে থাকে।
২. মেটাস্টেটিক, যা শরীরের অন্য জায়গায় উৎপন্ন হয়ে মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে।
চিকিৎসকদের মতে, মস্তিষ্কের টিউমারের কারণে হওয়া মাথাব্যথা অনেক সময় মাইগ্রেন বা টেনশনের মাথাব্যথা থেকে আলাদা হয়ে থাকে।
কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো:
১. এমন মাথাব্যথা, যা রাতে ঘুম ভেঙে দেয়
২. শরীরের অবস্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যথার ধরন বদলে যায়
৩. সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধে কাজ না করা
৪. কয়েক দিন বা সপ্তাহ ধরে স্থায়ী মাথাব্যথা
৫. ঘন ঘন মাথাব্যথা নিয়ে ঘুম থেকে ওঠা
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, সকালের মাথাব্যথার পেছনে স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো অন্য কারণও থাকতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, নতুন ধরনের বা অস্বাভাবিক মাথাব্যথা হলে সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিশেষ করে যদি ব্যথা ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং সাধারণ চিকিৎসায় কমে না, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা বিবেচনা করা উচিত।
১. মাথাব্যথা ক্রমাগত বাড়ছে এবং দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করছে
২. শরীরে আগে থেকেই ক্যান্সার ধরা পড়েছে এবং নতুন করে মাথাব্যথা শুরু হয়েছে
৩. মাথার পেছনে চাপ অনুভব হওয়া
৪. মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারানো
৫. ঝাপসা বা দ্বিগুণ দেখা, এমনকি দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া
৬. খিঁচুনি হওয়া বা কথা বলতে অসুবিধা
৭. বমি বমি ভাব বা বমির সঙ্গে মাথাব্যথা
৮. ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন, অকারণে বিভ্রান্ত হওয়া বা মানসিকভাবে গুটিয়ে যাওয়া
৯. শরীরের একপাশ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়া বা অনুভূতি কমে যাওয়া
নির্ণয়:
ব্রেন টিউমার শনাক্তে এমআরআই করতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিটি স্ক্যান করতে হয়।
প্রতিরোধ:
ব্রেন টিউমার প্রতিরোধ করার সুনির্দিষ্ট কোনো উপায় নেই। তবে ধূমপান থেকে বিরত থাকতে হবে। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ যথাসম্ভব পরিহার করতে হবে। যেমন মুঠোফোনের ব্যবহার কমানো। তেজস্ক্রিয় স্থান বা উৎস থেকে দূরে থাকা। খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিলে এবং নিয়মিত প্রচুর ফলমূল ও শাকসবজি খেলে ক্যানসার থেকে দূরে থাকা যায়।
চিকিৎসা:
মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে ব্রেন টিউমারের অস্ত্রোপচার করা হয়। এন্ডোস্কপির সাহায্যে খুলি না কেটে নাকের ছিদ্র দিয়ে পিটুইটারি টিউমারের অস্ত্রোপচার করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ জীবন যাপন করা সম্ভব।