
X
চিকিৎসায় ব্যবহার হয়েছে মানুষের মলও, প্রথমবারের মতো মিলল সত্যতা। বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো ভৌত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন যে প্রাচীন রোমানরা মানুষের মলকে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করত। তুরস্কের গবেষকদের এই আবিষ্কার রোমান চিকিৎসা-পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিনের লিখিত বর্ণনাকে বাস্তব প্রমাণে পরিণত করেছে।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন। জার্নাল অব আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স: রিপোর্টস এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, রোমান গ্রন্থে এই ধরনের চিকিৎসার উল্লেখ থাকলেও এবারই প্রথম এর সরাসরি বস্তুগত প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গবেষণার প্রধান লেখক, তুরস্কের সিভাস কামহুরিয়াত েবিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ সেনকার আতিলা জানান, তিনি ২০২২ সালে সহলেখক হিসেবে প্রকাশিত “কাঁচের বস্তু থেকে বার্গামা মিউজিয়াম” বইয়ের গবেষণার সময় বার্গামা জাদুঘরে রাখা কিছু রোমান কাচের বোতলে অবশিষ্ট পদার্থের চিহ্ন দেখতে পান। আতিলা সাতটি ভিন্ন পাত্রে অবশিষ্টাংশ খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রাচীন শহর পেরগামনে খনন করা একটি নিদর্শন থেকে কেবল একটি চূড়ান্ত ফলাফল পেয়েছিলেন।
পেরগামনে জন্ম নেয়া ধনী গ্রিক পরিবারের সন্তান গ্যালেন ছিলেন একজন খ্যাতনামা শারীরস্থানবিদ। তিনি তিনজন রোমান সম্রাটের চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছিলেন এবং তার চিকিৎসাবিষয়ক লেখাগুলো প্রায় ১৫০০ বছর ধরে প্রভাব বিস্তার করে। আতিলা বলেন, ‘গ্যালেন নিজেই যে ওষুধের কথা লিখেছিলেন, সেই ওষুধের বাস্তব নমুনা খুঁজে পাওয়া আমাদের জন্য ছিল দারুণ বিস্ময়কর এবং অসাধারণ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির।’
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাচীন লেখা অনুযায়ী মানুষের ও পশুর মল ব্যবহার করা হতো প্রদাহ, সংক্রমণ থেকে শুরু করে প্রজননজনিত নানা সমস্যার চিকিৎসায়। যদিও এসব উপাদান নিয়ে প্রায়ই রূপক ভাষায় বা সতর্কতার সঙ্গে আলোচনা করা হতো, তবে সেগুলোকে সব সময় ঘৃণ্য বা অযৌক্তিক হিসেবে দেখা হয়নি। বরং প্রাচীন ওষুধবিদ্যায় এগুলো ছিল এক ধরনের শক্তিশালী ও কার্যকর উপাদান।
আতিলা বলেন, এই গবেষণার ফলাফল প্রমাণ করে, যে চিকিৎসা-পদ্ধতি এতদিন কেবল প্রাচীন লিখিত উৎসেই জানা ছিল, তা এখন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মাধ্যমে বাস্তবভাবে প্রমাণিত হলো। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ দেয় যে আধুনিক চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাওয়া ‘ফিকাল ট্রান্সফার’ বা মল স্থানান্তর চিকিৎসা-পদ্ধতি প্রাচীনকালেও পরিচিত ছিল। এই পদ্ধতিতে সুস্থ ব্যক্তির মল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়, যাতে উপকারী মাইক্রোবায়োটার সুফল পাওয়া যায়।
ওষুধ রাখতে সাধারণত এক ধরনের কাচের বোতল ব্যবহৃত হতো। তবে আতিলা জানান, এই নির্দিষ্ট বোতলটি পরে চিকিৎসার কাজে পুনঃব্যবহার করা হয়। গবেষণায় পাওয়া থাইম (এক ধরনের ভেষজ উদ্ভিদ) ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করে আতিলা বলেন, ব্যাকটেরিয়া বিরোধী গুণের জন্য এবং মলের দুর্গন্ধ দমন করতে ব্যবহার করা হতো এটি।
এই গবেষক বলেন, বোতলটি খোলার সময় আমরা কোনো উল্লেখযোগ্য গন্ধ পাইনি।’ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ইতিহাসের এমেরিটাস অধ্যাপক নিকোলাস পারসেল বলেন, ‘এই অনুসন্ধানটি বৈজ্ঞানিকভাবে যথেষ্ট শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি বলেন, ফলাফল খুব একটা বিস্ময়কর নয়, কারণ রোমান লেখালেখিতে এ ধরনের চিকিৎসার উল্লেখ স্পষ্টভাবে রয়েছে। তবে এই লিখিত ঐতিহ্যকে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের সঙ্গে যুক্ত করা সত্যিই চমৎকার।
পারসেল জানান, তিনি জানতে আগ্রহী যে জাদুঘরে পৌঁছানোর আগে বোতলটি কোন প্রেক্ষাপটে পাওয়া গিয়েছিল। তার ধারণা, এটি হয়তো কোনো সমাধি থেকে উদ্ধার হতে পারে, যেখানে কোনো চিকিৎসক বা রোগীর সঙ্গে এটি কবর দেয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, এতদিন ধারণা ছিল যে সমাধিতে পাওয়া ছোট কাচের পাত্রগুলোতে মূলত সুগন্ধি বা প্রসাধনী থাকত। কিন্তু সেই ধারণার পরিসর আরও বিস্তৃত করা নতুন এই গবেষণার সবচেয়ে বড় অবদান হতে পারে।