
X
পবিত্র রমজান মাসে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সংযম ও ইবাদতের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির চর্চা করেন। এ সময় দৈনন্দিন জীবনযাপনে অনেকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়ে।
নাক-কান-গলার (ইএনটি) কোনো সমস্যা দেখা দিলে রোজা রেখে চিকিৎসা গ্রহণ করা যাবে কি না এ প্রশ্ন প্রায়ই রোগীদের মনে সংশয় তৈরি করে। নাকের স্প্রে, কানের ড্রপ, গড়গড়া বা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন রোজার ওপর প্রভাব ফেলে কি না, তা নিয়ে সচেতন দিকনির্দেশনা জরুরি। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও শরিয়াহর আলোকে বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে জানা থাকলে রমজানে চিকিৎসা গ্রহণ আরও সহজ ও স্বস্তিদায়ক হতে পারে। সঠিক তথ্য জেনে নিয়ে এসব বিষয়ে
অযথা ভয় না পেয়ে নিরাপদভাবে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। এসব বিষয়ে স্বাস্থ্য টিপস দিয়েছেন ডা: মোঃ আব্দুল হাফিজ শাফী।
টনসিলের প্রদাহ ও গলার সংক্রমণ:
টনসিলের প্রদাহ কিংবা গলার ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়ে। সাধারণত কিছু অ্যান্টিবায়োটিক দিনে তিন থেকে চারবার খেতে হয়, আবার কিছু দিনে এক বা দুবার খেলেই কার্যকর হয়। রমজান মাসে চিকিৎসকেরা সচেতনভাবে
এমন অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন করে থাকেন, যা ইফতার ও সেহরির সময় গ্রহণ করা সম্ভব। এতে রোগীর চিকিৎসাও সম্পন্ন হয়, আবার রোজাও বজায় থাকে। প্রয়োজনে ওষুধের ডোজ ও সময়সূচি বদল করে নেওয়া যায়। রোজা রেখে অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন শিরায় নেওয়া যায়।
তবে শক্তি বাড়িয়ে দেয়, এমন কিছু (যেমন স্যালাইন) শিরা পথে নেওয়া যাবে না।
রোজায় গড়গড়ার বিষয়ে সতর্কতা:
গলা ব্যথা, টনসিল প্রদাহ বা মুখের দুর্গন্ধের কারণে অনেকে দিনের বেলা লবণ-পানি কিংবা ওষুধমিশ্রিত পানি দিয়ে গড়গড়া করে থাকেন। তবে রোজা থাকা অবস্থায় চিকিৎসকেরা সাধারণত টনসিলে আক্রান্ত রোগীদের দিনের বেলায় গড়গড়া করতে নিরুৎসাহিত করেন।
কারণ গড়গড়া করার সময় অল্প পরিমাণ তরল অনিচ্ছাকৃতভাবে গলা দিয়ে পাকস্থলীতে পৌঁছে যেতে পারে, যা রোজা ভঙ্গের কারণ হতে পারে। তাই রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় গড়গড়া করা থেকে বিরত থাকাই ভালো। প্রয়োজনে ইফতারের পর কিংবা সেহরির সময় গড়গড়া করা যেতে পারে।
সাইনোসাইটিস ও নাকের সমস্যা:
রোজার সময় অনেকের সাইনোসাইটিসে নাক বন্ধ, মাথাব্যথা কিংবা নাক দিয়ে পুঁজ পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে নাকের ড্রপ বা স্প্রে ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। রোজা অবস্থায় দিনের বেলা নাকে ওষুধ প্রয়োগে তা নাক দিয়ে গলা হয়ে পাকস্থলীতে পৌঁছানোর আশঙ্কা থাকে।
তাই সেহরির সময় ও ইফতারের পর নাকের ড্রপ বা স্প্রে ব্যবহার করা নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। চিকিৎসক প্রয়োজনে ডোজ সমন্বয় করে দিতে পারেন। পানি স্বল্পতা হলে মাইগ্রেনের তীব্রতা বাড়ে; তাই মাইগ্রেনের রোগীদের যেন রোজায় পানির ঘাটতি না হয়, তা ইফতার ও সেহরির সময় বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে।
কান পাকা এবং কানের অন্যান্য রোগ:
কান পাকা কিংবা সংক্রমণে কানে ড্রপ ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। সাধারণভাবে মনে করা হয়, কানে ওষুধ দিলে রোজা ভাঙে না। কিন্তু বাস্তবে অনেক রোগীর কানের পর্দায় (ইয়ারড্রাম) ছিদ্র থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে কানে দেওয়া তরল ওষুধ কানের সঙ্গে নাকের সংযোগকারী টিউব দিয়ে
ভেতরের পথে গলা পর্যন্ত পৌঁছানোর শঙ্কা থাকে। তাই রোজা থাকা অবস্থায় কানে ড্রপ ব্যবহার না করে সেহরি এবং ইফতারের পর ব্যবহার করাই উত্তম ও নিরাপদ।
রোজা ভঙ্গের বিষয়ে শরিয়াহর দৃষ্টিভঙ্গি:
ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে পাকস্থলীতে কোনো কিছু পৌঁছালে রোজা ভেঙে যায়। এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নাকে পানি দেওয়ার সময় ভালোভাবে নাকে পানি পৌঁছাবে, তবে রোজা থাকলে অতিরিক্ত করবে না।’ সুনান আবু দাউদ, তিরমিজি (সহিহ)
এই হাদিসের আলোকে আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, নাক এমন একটি পথ, যার মাধ্যমে কোনো কিছু পাকস্থলীতে পৌঁছাতে পারে। তাই রোজা অবস্থায় নাক দিয়ে কোনো তরল প্রবেশ করানো থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ।
পরিকল্পিত ও সচেতনভাবে রমজানে নাক-কান-গলার চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। চিকিৎসক ও রোগীর সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন চিকিৎসা দেওয়া যায়, যাতে রোগ নিরাময় হয় এবং রোজার পবিত্রতাও অক্ষুণ্ন থাকে।