আগামী ১০ মার্চ পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করতে যাচ্ছে সরকার। প্রথম ধাপে দেশের ১৪টি উপজেলায় একটি করে ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডে এই কার্ড বিতরণ করা হবে।
সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভা শেষে সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
নির্বাচনী অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়নের পথে:
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি ছিল সরকারের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। সরকার গঠনের পর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঈদের আগেই হতদরিদ্র পরিবারের হাতে কার্ড পৌঁছে দিতে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন-২০২৬’ শীর্ষক নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে। এ নীতিমালার মূল দর্শন— ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। খুব শিগগিরই এটি প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হবে।
কারা পাবেন না ফ্যামিলি কার্ড
নীতিমালা অনুযায়ী, সব শ্রেণির মানুষ এই সুবিধা পাবেন না। ছয় শ্রেণির নাগরিককে ফ্যামিলি কার্ডের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। তারা হলেন—
পরিবারের কোনো সদস্য সরকারি পেনশনভোগী হলে
বাড়িতে এসি ব্যবহারকারী বা গাড়িসহ বিলাসবহুল সম্পদের মালিক
পরিবারের সদস্য সরকারি চাকরিজীবী হলে
বাণিজ্যিক লাইসেন্সধারী
বড় ব্যবসার মালিক
উচ্চ আয়ের নির্দিষ্ট শ্রেণিভুক্ত পরিবার
অন্যদিকে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্ড পাবেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রকৃত যোগ্য পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শ্রেণি
নীতিমালায় বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে—
ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার
প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছে এমন পরিবার
অনগ্রসর জনগোষ্ঠী যেমন হিজড়া, বেদে ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী
শূন্য দশমিক পাঁচ একর বা তার কম জমির মালিক পরিবার
স্বচ্ছতার ওপর জোর
সুবিধাভোগী নারী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে। সরকারি খানা জরিপ এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ডাটাবেজ ব্যবহার করে প্রকৃত দরিদ্রদের শনাক্ত করা হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) যাচাইয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হবে।
অর্থ বিতরণ ও ডিজিটাল সুবিধা
সরকারি কোষাগার থেকে নির্ধারিত অর্থ সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে। বিদ্যমান টিসিবি কার্ডকে ফ্যামিলি কার্ডের ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ হিসেবে রূপান্তর করা হবে। একই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে ওটিপি ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সহায়তা গ্রহণ করা যাবে। ভবিষ্যতে শিক্ষা উপবৃত্তি ও কৃষি ভর্তুকিও এই কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাজেট ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য
গাইডলাইনে ২০২৮ সালের মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা বাজেট জিডিপির তিন শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে ৯৫টির বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু থাকলেও সমন্বয়হীনতা, একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা গ্রহণ এবং প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ পড়ার মতো সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা দূর করে একটি সমন্বিত ও বৈষম্যহীন সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
দীর্ঘমেয়াদে ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে একটি সর্বজনীন ‘সোশ্যাল আইডি কার্ড’ হিসেবে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
পাইলট প্রকল্পের এলাকা ও বরাদ্দ
পাইলট প্রকল্পের আওতায় দেশের ১৩টি এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে।
বনানী কড়াইল বস্তি (শহুরে বস্তি এলাকা),
পটিয়া (শিল্প এলাকা),
লামা (পার্বত্য এলাকা),
দিরাই (হাওর এলাকা),
ঠাকুরগাঁও সদর (সীমান্তবর্তী এলাকা)
এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের ঘনত্ব, ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ ও অনগ্রসরতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাইলটিং প্রকল্পের জন্য মোট ২ কোটি ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার ৭৭ শতাংশ অর্থ সরাসরি দরিদ্র পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছাবে।
কত পরিবার পাবেন সুবিধা
প্রথম ধাপে ১৪টি উপজেলায় প্রতিটি ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত নারীদের কার্ড দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার হতদরিদ্র পরিবার এই সুবিধা পাবে। প্রত্যেক পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে দুই কোটি দরিদ্র পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মসূচি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে সব ধরনের নগদ ভাতা ও টিসিবির সহায়তা একটি কার্ডের আওতায় একীভূত করা হবে।