
X
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণে নির্বাচন-পরবর্তী উন্নত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার অত্যাবশ্যকীয়তা শীর্ষক মতবিনিময় সভা অদ্য ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন-এর চেয়ারপার্সন এ এইচ এম আহসান এবং এফবিসিসিআই’র প্রশাসক মোঃ আবদুর রহিম খান যথাক্রমে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বিগত কয়েকবছর ধরে কঠোর মুদ্রানীতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনাকাঙ্খিত অবনতি, অবৈধ চাঁদাবাজি, অনিয়ম ও দূর্নীতি, প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতা সহ নানাবিধ কারণে বেসরকারিখাতে কাঙ্খিত মাত্রায় অগ্রগতি অর্জিত হয়নি, তবে নব-নির্বাচিত এ সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিশেষকরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের মাধ্যমে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজীকরনে উদ্যোগী হবে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ ও অনুমেয় পরিবেশ নিশ্চিতের কোন বিকল্প নেই বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। এছাড়াও বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নীতিনির্ধারক প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনৈতিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থা গুলোর সাথে বেসরকারিখাতের সমন্বয় আরো বাড়ানোর উপর তিনি জোরারোপ করেন।
প্রধান অতিথি’র বক্তব্যে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপার্সন এ এইচ এম আহসান বলেন, সরকার ও বেসরকারিখাতের কার্যকর উদ্যোগের ফলে এবছর রমজানে বিশেষকরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে বেশ স্থিতিশীলতা পরিলক্ষিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাজার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহ সমন্বয় করার কোন বিকল্প নেই, সেই সাথে ব্যবহৃত পণ্যের সঠিক তথ্য-উপাত্ত নিশ্চিতের খুবই জরুরী। তিনি জানান, দেশে ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় হ্রাস পায়, যেটি পণ্যের মূল্য হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে থাকে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে সহযোগিতার জন্য সকল স্তরের জনগনকে এগিয়ে আসার উপর তিনি জোরারোপ করেন এবং নবগঠিত নির্বাচিত এ সরকার সকল স্তরে আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিতে আরো সুদৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিশেষ অতিথি’র বক্তব্যে এফবিসিসিআই’র প্রশাসক মোঃ আবদুর রহিম খান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও বাজার ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু থাকার কোন বিকল্প নেই, যা গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিশ্চিতের মাধ্যমে যা আরো সহজতর হবে। তিনি বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা গেলে, রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন সম্ভব হবে, যা আইন ও নীতি বহিভূত কার্যক্রম হ্রাসে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে এ বিষয়ে দ্রততার সাথে কিছু সংষ্কার কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে, যার মাধ্যমে দৃশ্যমান পরিবর্তন পরিলক্ষিত হবে এবং জনগনের মাঝে আশার সঞ্চার হবে বলে তিনি অভিমত জ্ঞাপন করেন।
অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইআইটি অধিশাখা) শিবির বিচিত্র বড়ুয়া, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর-এর পরিচালক (যুগ্ম-সচিব, কার্যক্রম ও গবেষণাগার বিভাগ) আব্দুল জলিল এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-এর উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ অংশগ্রহণ করেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইআইটি অধিশাখা) শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, সার্বিক উন্নয়নের জন্য উন্নত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোন বিকল্প নেই, এর অভাবে আস্থার সংকট থাকায় স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ স্থল হয়ে যায়। তিনি বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আইপিও নীতিমালা ২০২৫-২৮ প্রকাশ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, যার ফলে ব্যবসা ও বিনিয়োগ কার্যক্রম আরো সহজতর হবে।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আব্দুল জলিল বলেন, আমাদের উৎপাদিত আলুতে অতিরিক্ত পরিমাণ সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে এর গুণগত মান কমে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মানদন্ড ঠিক না থাকায় বাংলাদেশে বিদেশে আলু রপ্তানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ বিষয়ে কৃষক, উদ্যোক্তা ও সরকারী সংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যকর উদ্যোগের উপর তিনি জোরারোপ করেন।
ডিএমপি’র উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে রাজধানী ঢাকায় প্রায় ৫লক্ষ ব্যাটারি চালিত নতুন অটো রিক্সা যোগ হয়েছে, যা সড়কে যানজট তৈরিতে বেশ ভালো ভূমিকা রাখছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশের পক্ষ হতে ইতোমধ্যে বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং আশা প্রকাশ করেন ঈদের পর এক্ষেত্রে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হবে এবং নগরবাসীর মাঝে স্বস্তি আসবে। তবে অটোরিক্সা নিয়ন্ত্রণে এতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানি নীতিমালা ও চার্জের জন্য ব্যবহৃত গ্যারেজসমূহ নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষনের আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। এছাড়াও যানজট হ্রাসে ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে দোকান বসানো থেকে বিরত থাকতে জনগনের প্রতি আহ্বান জানান এবং বিশেষকরে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পক্ষ হতে সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে আশ্বাস প্রদান করেন।
উক্ত মতবিনিময় সভার মুক্ত আলোচনায় বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী আবুল হাসেম, বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্য তেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী মোঃ গোলাম মওলা, বাংলাদেশ ক্রোকারিজ মার্চেন্টস এসোসিয়েশনে সভাপতি হাজী মোঃ মনির হোসেন, মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী মোহাম্মদ আলী ভূট্টো, ঢাকা চেম্বারের প্রাক্তন ঊর্ধ্বত সহ-সভাপতি এম এস সেকিল চৌধুরী এবং নাহার কোল্ডস্টোরেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ তরিকুল ইসলাম খান প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।
হাজী আবুল হাসেম বলেন, ব্যবসায়ীদের জন্য যানজট ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি দুটোই অন্যতম কারণ, যা রোধে সরকারকে বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। ভ্যাট ও ট্যাক্স বিষয়ে একটি সহনীয় নীতি প্রয়োজন বলে তিনি অভিমত জ্ঞাপন করেন, যার ফলে ব্যবসায়ীরা স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।
হাজী মোঃ গোলাম মওলা বলেন, সংকটকালে বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হলেও পরস্থিতি উন্নয়নের পর সার্বিকভাবে পরিস্থিতি উন্নয়নে তেমন কোন পদেক্ষেপ পরিলক্ষিত হয় না। এছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় কোন পণ্যের সঠিক তথ্য না থাকার কারণে বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। সেই সাথে পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আরো কঠোর পদক্ষে গ্রহণ করার উপর তিনি জোরারোপ করেন।
হাজী মোঃ মনির হোসেন বলেন, যানজট নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন করা সম্ভব হলে ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
হাজী মোহাম্মদ আলী ভূট্ট বলেন, ব্যবসা সহজীকরনের কথা বললেও নিত্য-প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে স্বল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেওয়ার কারণে অনেকক্ষেত্রে সিন্ডিকেট তৈরি হয়, এর ফলে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়, তাই বিশেষকরে এধরনের পণ্য আমদানিতে বেশি সংখ্যক সত্যিকারের ব্যবসায়ীদের অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন।
মোঃ তরিকুল ইসলাম খান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নাহার কোল্ডস্টোরেজ লিমিটেড বলেন, আলু বর্তমানে সবচেয়ে কমমূল্যে বিক্রি হচ্ছে, উত্তরবঙ্গের অনেক জায়গায় কেজি প্রতি ৮টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় কৃষকরা মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এবং ভোক্তভুগী কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বললেও তা নিশ্চিত করা হয়নি।
ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো: সালিম সোলায়মন সহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।