
X
খোন্দকার শাহিদুল হক
পবিত্র রমজান মাসে আমরা এমন এক সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যখন রহমতের অধ্যায় পেরিয়ে মাগফেরাতের পর্বে প্রবেশ করেছি। সামনে নাজাত।
বহুদিন ধরে আমরা শুনে আসছি, রোজার প্রথম দশ দিন রহমত, পরের দশ দিন মাগফেরাত, আর শেষ দশ দিন নাজাত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ধাপগুলো কি কেবল ক্যালেন্ডারের মতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে আর চলে যায়? নাকি এগুলো আমাদের গ্রহণের জন্য উন্মুক্ত এক এক দরজা?
আল্লাহর অনুগ্রহ কখনো কৃপণ নয়। তিনি রহমত নিয়ে বান্দার সামনে আসেন। কিন্তু গ্রহণ করার দায়িত্ব বান্দার। সূর্য প্রতিদিন আলো নিয়ে উদিত হয়। আলো সবার জন্য সমানভাবে ছড়ায়। কিন্তু কেউ যদি দিনের বেলা ঘুমিয়ে থাকে, সে আলো থেকে বঞ্চিত হয়। সূর্যের দায়িত্ব শেষ হয়, কিন্তু ঘুমন্ত মানুষের প্রাপ্তি শূন্য থেকে যায়। রমজানের রহমতও তেমনই। রহমত এসেছে, কিন্তু আমরা কি জাগ্রত ছিলাম?
রহমতের সময় আমাদের হৃদয় কোমল হওয়ার কথা ছিল। অন্যের কষ্ট বুঝতে শেখার কথা ছিল। কৃতজ্ঞতা, সহমর্মিতা, দয়া ও সংযমের গুণ অর্জনের কথা ছিল। যদি সেই দশ দিন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় কেটে যায়, তবে রহমতের দরজা খোলা থাকলেও আমরা ভেতরে প্রবেশ করতে পারিনি।
এখন চলছে মাগফেরাতের সময়। এটি আত্মসমালোচনার সময়। নিজের ভুল স্বীকার করার সময়। গুনাহ থেকে ফিরে আসার সময়। মাগফেরাত মানে কেবল ক্ষমা চাওয়া নয়, পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নেওয়া। নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, মানুষের হক আদায়, অন্যায় থেকে বিরত থাকা, অন্তরের অহংকার ভেঙে ফেলা, এই সবই মাগফেরাতের পথে এগিয়ে যাওয়ার আমল। কিন্তু শুধু জানা যথেষ্ট নয়। চেষ্টা না থাকলে মাগফেরাতও অধরাই থেকে যায়।
সামনে নাজাত। নাজাত মানে মুক্তি। গুনাহের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি, জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। নাজাত হঠাৎ করে পাওয়া যায় না। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক সাধনা। প্রথম বিশ দিনের প্রস্তুতি যদি আন্তরিক হয়, তবে শেষ দশ দিনের ইবাদত গভীরতর হয়। লাইলাতুল কদরের মতো মহিমান্বিত রাতও এই পর্বেই আসে, যেন বান্দা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে নিতে পারে।
আমরা অর্ধেক পথ পেরিয়েছি। সামনে এখনো সময় আছে। এই সময়টুকু যদি সচেতনভাবে ব্যবহার করি, তবে অনেক কিছুই অর্জন সম্ভব। রমজান আমাদের সামনে কেবল আচার নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ আত্মিক শিক্ষাক্রম নিয়ে আসে। সংযম শেখায়, মানবিকতা শেখায়, ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার ভ্রম ভাঙতে শেখায়।
রমজান শেষে যদি আমাদের ভেতরে কোনো পরিবর্তন না আসে, যদি ঈদের নামাজের পরেই সব অভ্যাস আগের মতো হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে আমরা সূর্যের আলোতে থেকেও চোখ বন্ধ রেখেছিলাম। কিন্তু যদি আমরা অনুভব করি, আমরা কিছুটা মানবিক হয়েছি, অন্যকে ভালোবাসতে শিখেছি, নিজের ভুল নিয়ে সজাগ হয়েছি, তবে বুঝব রমজান আমাদের স্পর্শ করেছে।
আসুন, এই বাকি সময়টুকু ঘুমিয়ে না কাটিয়ে জেগে থাকি। রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের প্রতিটি স্তরের মর্মার্থ উপলব্ধি করে সিয়াম সাধনায় মন দিই। তাহলে রমজান শুধু একটি মাস হয়ে থাকবে না, আমাদের সমগ্র জীবনকে পবিত্রতার আলোয় আলোকিত করে যাবে।