মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আগামী তিন মাসের জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় ফার্নেস অয়েলের মজুদ রয়েছে মার্চ মাস পর্যন্ত। ফলে এপ্রিল মাসে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ইতোমধ্যে এপ্রিলের ফার্নেস অয়েল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি নিয়েও দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
সরকার অবশ্য আশ্বস্ত করেছে, আপাতত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হবে না।
কুয়েত থেকে এলএনজি সরবরাহ অনিশ্চিত
ইরানে হামলা ও দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার জেরে গত তিন দিনে ইরান কুয়েতে দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন, ১৫ মার্চের পর কুয়েত থেকে দুটি এলএনজি কার্গো আসার কথা রয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে, তবে এখনো জবাব পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, কুয়েত অনেক সময় অ্যাঙ্গোলা, মালয়েশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া থেকেও এলএনজি সরবরাহ করে থাকে। এবারও বিকল্প উৎস ব্যবহার করা গেলে বাংলাদেশের জন্য তা স্বস্তিদায়ক হবে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করে, যার মধ্যে ৪০ লাখ টনই আসে কুয়েত থেকে। প্রতি মাসে ২-৩টি কার্গো আসে দেশটি থেকে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এসব কার্গো না এলে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। প্রয়োজনে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
জ্বালানি তেলের আমদানি পরিকল্পনা
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, এপ্রিল পর্যন্ত ১৫-১৬টি জ্বালানি তেলের পার্সেল দেশে আসার কথা রয়েছে। এর বেশিরভাগই পরিশোধিত তেল, যা চীন, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন বন্দর থেকে আসবে—যেগুলো হরমুজ প্রণালির বাইরে।
তবে সৌদি আরব থেকে দুটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ আসার কথা রয়েছে, যা হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসতে পারে। বিপিসি জানিয়েছে, বিকল্প রুট ব্যবহার করে তেল আনার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশে বছরে ৭০ লাখ টনের বেশি জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়, যার মধ্যে ১৩ লাখ টন অপরিশোধিত তেল। এই অপরিশোধিত তেলের বড় অংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। প্রণালি বন্ধ থাকলে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।
তেলের দাম আপাতত বাড়ছে না
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৫ ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি অবনতি হলে দাম ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে।
সরকার ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্চ মাসের জন্য জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করেছে। জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মাসে দাম বাড়ানো হবে না। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দীর্ঘ সময় ধরে ঊর্ধ্বমুখী থাকলে এপ্রিল মাসে মূল্য সমন্বয় করা হতে পারে।
ফার্নেস অয়েল ঘাটতির আশঙ্কা
দেশে বর্তমানে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। মার্চ মাসে এসব কেন্দ্রের জন্য ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৯ টন ফার্নেস অয়েল মজুদ আছে, যা মার্চ এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে।
তবে নতুন করে ফার্নেস অয়েল আমদানি না হলে এপ্রিল মাসে মারাত্মক লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা রয়েছে।