
X
প্রতীকী ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর এর প্রভাব এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বাজার, শিল্প উৎপাদন, কৃষি খাত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচের ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি আবারও দেখিয়ে দিয়েছে যে বিশ্ব অর্থনীতি এখনও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর কতটা নির্ভরশীল।
সরবরাহ সংকট ও দাম বৃদ্ধি
যুদ্ধ শুরুর পর উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু উৎপাদনকারী দেশ উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়।
এক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছায়। পরে দাম কিছুটা কমলেও তা এখনও যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় অনেক বেশি।
এই পরিস্থিতিতে অনেক দেশেই জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।
হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে।
বর্তমান সংঘাতের কারণে ওই এলাকায় জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় তেল সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধাক্কা খেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল বা নরওয়ের মতো মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের উৎপাদনকারী দেশগুলো দ্রুত উৎপাদন বাড়িয়ে এই ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না।
এদিকে রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরাকে তেল উৎপাদন ৬০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও উৎপাদন কমানোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
গ্যাস সরবরাহেও প্রভাব
সংকট শুধু তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। সামরিক উত্তেজনার কারণে কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন আংশিক স্থগিত করায় বিশ্বে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহও বড় ধাক্কা খেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই এশিয়া ও ইউরোপে জ্বালানির ঘাটতি আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে।
এরই মধ্যে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল কয়েকটি দেশ দামের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ ও জ্বালানি বিতরণে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা চালু করার কথা ভাবছে।
অর্থনীতিতে চাপ
জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে শিল্প উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর। ফলে পণ্যের দামও বাড়তে শুরু করে।
ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে প্রতি গ্যালন প্রায় সাড়ে তিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব অনুযায়ী, তেলের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে পৌঁছে যায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.৪ শতাংশ কমে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে।
শিল্প ও কৃষিতে সম্ভাব্য প্রভাব
জ্বালানি সংকটের প্রভাব প্রযুক্তি শিল্পেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ তাইওয়ানের মতো বড় চিপ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
ফলে গাড়ি, স্মার্টফোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য অ্যালুমিনিয়াম, সালফার ও ইউরিয়ার বড় সরবরাহকারী। এসব উপাদান ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সার উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়লে খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে।
কৃষকদের উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রে মার্চ ও এপ্রিল মাসে চাষাবাদের মৌসুম শুরু হওয়ার আগে বিপুল পরিমাণ সার আমদানি করা হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সার সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন কৃষক হ্যারি অট জানিয়েছেন, সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় তার প্রতি একর জমিতে খরচ প্রায় ১০০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তার মতে, এ পরিস্থিতি কৃষকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিক প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে এশিয়া ও ইউরোপে। কারণ এসব অঞ্চল জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
যুদ্ধ শুরুর পর জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। জার্মানির প্রধান শেয়ার সূচকও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তুলনামূলক কম প্রভাব পড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত দ্রুত সমাধান না হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই পড়বে। (সূত্র: বিবিসি বাংলা)