
X
সংগৃহীত ছবি
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে তেহরান। ইরানের দাবি, এসব হামলা মূলত ওই দেশগুলোর মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাকে লক্ষ্য করে প্রতিশোধমূলকভাবে চালানো হচ্ছে।
তেহরান বলছে, তাদের ওপর হামলা বন্ধ হলে তারাও পাল্টা জবাব দেওয়া বন্ধ করবে। তবে এসব হামলার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের পাশে দাঁড়াক। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের ঘোষণা দেয়নি।
গত শুক্রবার ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের আর্লিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেন, উপসাগরীয় মিত্ররা ইরানের বিরুদ্ধে আরও সক্রিয় ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিচ্ছে। তার ভাষ্য, ‘পরিস্থিতি এখন ওয়াশিংটনের অনুকূলে যাচ্ছে এবং আমাদের সুবিধা বাড়ছে।’
তবে উপসাগরীয় দেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে যোগ না দেওয়ায় হেগসেথের এমন মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
একই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বিশ্বের জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ইরানের নিয়ন্ত্রণ জোরদার হয়েছে। ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ চলাচল করলে হামলার শিকার হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইরানের ওপর হামলা না চালানোর অনুরোধ জানিয়েছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, যুদ্ধ শুরু হলে তারা ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। ইতিমধ্যে দোহা, দুবাই ও মানামাতে ইরানের হামলার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে United Nations Security Council–এ পাস হওয়া এক প্রস্তাবে উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার সদস্যদেশগুলোর ওপর ইরানের হামলার নিন্দা জানানো হলেও ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। প্রস্তাবটির ভোটাভুটির পর এক বিশ্লেষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইরানের আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়া এখন আর স্লোগান নয়, বরং বাস্তবতা।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডেলিস্ট আই এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলো শুরুতে ইরানের ওপর হামলা ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এখন নিজেরাই হামলার শিকার হওয়ায় তারা ইরানের ওপর ক্ষুব্ধ। একই সঙ্গে নিরাপত্তা উদ্বেগ যথাযথভাবে গুরুত্ব না দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিও তাদের অসন্তোষ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯১ সালের আরব যুদ্ধের পর উপসাগরীয় অঞ্চলে গড়ে ওঠা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোই এসব দেশকে ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।
জ্বালানি বাজারে প্রভাব
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি হয়। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান কার্যত এই নৌপথে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
হামলার মুখে কুয়েত, ইরাক, বাহরাইন, কাতার, আরব আমিরাত ও সৌদি আরব জ্বালানি উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে।
পণ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ক্যাপলারের তথ্যের বরাতে ফিনেন্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর উপসাগরীয় দেশগুলো জ্বালানি খাতে প্রায় ১ হাজার ৫১০ কোটি ডলারের রাজস্ব হারিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত।
বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের এমন বক্তব্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। কারণ, ইরান আগেই সতর্ক করেছে—যেসব দেশ এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সমর্থন দেবে, তাদের ওপর কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে।