মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আবারও আলোচনায় এসেছে ইরানের সামরিক কৌশল “মোজাইক প্রতিরক্ষা”। বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের আক্রমণ সত্ত্বেও ইরান কেন দ্রুত ভেঙে পড়ে না তার বড় কারণ এই কৌশল। এই প্রতিরক্ষা মতবাদের মূল স্থপতি হিসেবে পরিচিত ইরানের সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মোহম্মদ আলী জাফারি।
মোহাম্মদ আলী জাফারি কে
মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জাফারি ইরানের প্রভাবশালী সামরিক নেতা। তিনি ২০০৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী(আইআরজিসি)-এর কমান্ডার-ইন-চিফ ছিলেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর তিনি আইআরজিসিতে যোগ দেন এবং ইরানের কুর্দিস্তান অঞ্চলে একটি গোয়েন্দা ইউনিটে কাজ শুরু করেন। পরে ১৯৮০-১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নিয়ে সামরিক নেতৃত্বে দ্রুত উন্নতি লাভ করেন।
১৯৯২ সালে তিনি আইআরজিসির স্থলবাহিনীর কমান্ডার হন এবং এলিট ইউনিট “সারাল্লাহ”র নেতৃত্বও দেন। ২০০৫ সালে আইআরজিসির স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নতুন সামরিক কৌশল নিয়ে কাজ শুরু করেন, যা পরবর্তীতে “মোজাইক প্রতিরক্ষা” নামে পরিচিত হয়।
‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’ কী
মোজাইক প্রতিরক্ষা হলো এমন একটি সামরিক ধারণা যেখানে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একটি কেন্দ্রীয় কমান্ডে সীমাবদ্ধ না রেখে বহু আঞ্চলিক ও আধা-স্বাধীন ইউনিটে ভাগ করা হয়।
এই কাঠামোর অধীনে আইআরজিসি, বাসিজ বাহিনী, নিয়মিত সেনা ইউনিট, ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী, নৌ ইউনিট ও স্থানীয় কমান্ডগুলো একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাজ করে। ফলে কোনো একটি ইউনিট ধ্বংস হলেও পুরো সামরিক কাঠামো অচল হয়ে পড়ে না।
ইরানে আইআরজিসি মোট ৩১টি প্রাদেশিক কমান্ডে বিভক্ত। প্রতিটি কমান্ড নিজস্ব অস্ত্র, গোয়েন্দা ব্যবস্থা ও নেতৃত্ব নিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সামরিক ইউনিট হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিচ্ছিন্ন হলেও স্থানীয় ইউনিটগুলো স্বাধীনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম।
কেন এই কৌশল তৈরি করা হয়
২০০১ সালে আফগানিস্তান এবং ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান ইরানের সামরিক কৌশলে বড় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের দ্রুত পতন তেহরানকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
এর পর থেকেই ইরান এমন একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে যাতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা রাজধানী আক্রান্ত হলেও সামরিক প্রতিরোধ অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়।
কৌশলের মূল লক্ষ্য
বিশেষজ্ঞদের মতে মোজাইক প্রতিরক্ষার দুটি প্রধান লক্ষ্য রয়েছে-
শক্তিশালী প্রতিপক্ষের জন্য ইরানের কমান্ড ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা কঠিন করে তোলা। যুদ্ধক্ষেত্রকে দীর্ঘমেয়াদি ও বহুস্তরবিশিষ্ট করে তোলা, যাতে প্রতিপক্ষ দ্রুত বিজয় অর্জন করতে না পারে।
এ কারণে এই মতবাদে নিয়মিত যুদ্ধের পাশাপাশি অনিয়মিত যুদ্ধ, স্থানীয় প্রতিরোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়যুদ্ধের কৌশলও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানকে সম্ভাব্য বড় আকারের আক্রমণের পরেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দেয়—যা দেশটির সামরিক কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।