শিয়া সম্প্রদায়, বিশ্বাস-বিভাজন প্রশ্নে আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি

অনলাইন ডেস্ক

ধর্ম

শিয়া সম্প্রদায়ের পরিচয়, মতপার্থক্য এবং তাদের ইসলামি অবস্থান নিয়ে কুরআন-হাদিস ও আলেমদের মতামতের আলোকে বিশ্লেষণ।

2026-04-09T17:10:52+00:00
2026-04-09T17:10:52+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
শিয়া সম্প্রদায়, বিশ্বাস-বিভাজন প্রশ্নে আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১০ পিএম   (ভিজিট : ৮৭)
প্রতীকী ছবি
X

প্রতীকী ছবি


ইসলামের ইতিহাসে মতপার্থক্য নতুন নয়, বরং তা এক দীর্ঘ বৌদ্ধিক ও ঐতিহাসিক ধারার অংশ। নবী মুহাম্মদ সা. এর ইন্তেকালের পর নেতৃত্বের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যে বিভাজনের সূচনা, তা ক্রমান্বয়ে আকিদা, ব্যাখ্যা ও ধর্মীয় দর্শনের পার্থক্যে রূপ নেয়। 


এই ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো ‘শিয়া’ যারা মূলত হজরত আলীর (রা.) প্রতি বিশেষ আনুগত্যের ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করে। 

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পরিচয় একক রূপে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বিভিন্ন গোষ্ঠী, মতাদর্শ ও ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে। ফলে ‘শিয়ারা মুসলিম কি না’ কিংবা ‘কোন দলকে কাফের বলা হয়’ এই প্রশ্নগুলো সহজ বা একরৈখিক নয়, বরং গভীর বিশ্লেষণসাপেক্ষ। 

ইসলামি শরীয়তে কাউকে ‘কাফের’ ঘোষণা করা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। এ প্রসঙ্গে নবীজি (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, কেউ যদি তার ভাইকে ‘কাফের’ বলে, তবে তা তাদের একজনের ওপর ফিরে আসে। 

এই হাদিস আলেমদের মধ্যে একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে অকারণে বা তাড়াহুড়ো করে কাউকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার করা যাবে না। 

প্রাচীন ফিকহবিদদের মধ্যে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এ বিষয়ে অত্যন্ত সংযত অবস্থান গ্রহণ করেন। তার সঙ্গে সম্পর্কিত বক্তব্যসমূহে দেখা যায়, তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, যেমন আল্লাহর একত্ব, নবুওয়াতের সমাপ্তি এবং কুরআনের সত্যতা অস্বীকার না করে, তাকে সরাসরি কাফের বলা উচিত নয়। তার এই অবস্থান ইসলামের ভেতরে মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে একটি সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে। 

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসাকে ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তবে তিনি একইসঙ্গে সতর্ক করেছেন সেইসব প্রবণতা থেকে, যেখানে ইমামদের মর্যাদা অতিরঞ্জিত করে নবীদের পর্যায়ে বা তার ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া হয়। 


ইবনু তাইমিয়্যা (রহ.) তার বিশ্লেষণে শিয়াদের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, শিয়াদের মধ্যে এমন কিছু দল রয়েছে যারা সাহাবায়ে কেরামের (রা.) ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেয় এবং কিছু ক্ষেত্রে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ধারণা পোষণ করে। 

যেমন, কুরআন বিকৃত হয়েছে এমন বিশ্বাস, অথবা ইমামদেরকে অতিমানবিক বা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে দেখা। এসব বিশ্বাসকে তিনি গুরুতর বিচ্যুতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে একইসঙ্গে তিনি এটাও স্পষ্ট করেন যে, সব শিয়া একই নয়, অনেকেই এসব চরমপন্থী ধারণা থেকে মুক্ত। 

ইমাম যাহাবী (রহ.) ও ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) তাদের গবেষণায় শিয়াদের মধ্যে দুই ধরনের প্রবণতার কথা তুলে ধরেছেন মধ্যপন্থী ও চরমপন্থী। 

মধ্যপন্থীরা হজরত আলীর (রা.) প্রতি বিশেষ ভালোবাসা পোষণ করলেও অন্যান্য সাহাবীদের সম্মান বজায় রাখে এবং ইসলামের মৌলিক আকিদা অক্ষুণ্ণ রাখে। এই ধরনের গোষ্ঠীকে সাধারণত ইসলামি পরিসরের ভেতরে বিবেচনা করা হয়েছে। 

অন্যদিকে, চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো সাহাবীদের নিন্দা করে, বা এমন কিছু বিশ্বাস পোষণ করে যা ইসলামের মৌলিক ভিত্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এসব ক্ষেত্রে আলেমরা কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের ইসলাম থেকে বিচ্যুত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। 

শিয়া সম্প্রদায়ের ভেতরে প্রধানত তিনটি বড় গোষ্ঠী বিদ্যমান। বারো ইমামে বিশ্বাসী গোষ্ঠী সবচেয়ে বড়, যারা মনে করে ইমামতের ধারাবাহিকতা নির্দিষ্ট বারোজন ইমামের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। 

দ্বিতীয়ত, ইসমাইলিয়া, যারা ইমামতের ধারাবাহিকতায় ভিন্ন মত অনুসরণ করে এবং আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার দিকে বেশি ঝোঁক রাখে। 

তৃতীয়ত, জায়দিয়া, যারা তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী এবং কিছু ক্ষেত্রে সুন্নি ধারার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। 

এই আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে শিয়াদের মধ্যে সবাইকে এককভাবে বিচার করা সঠিক নয়। বরং তাদের বিশ্বাস, গোষ্ঠী ও মতাদর্শ অনুযায়ী পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। 

ইসলামের দৃষ্টিতে মূল প্রশ্ন হলো কোনো গোষ্ঠী কি ইসলামের মৌলিক ভিত্তি অস্বীকার করছে, নাকি কেবল ব্যাখ্যাগত ভিন্নতা রয়েছে। 

কুরআন মুসলিম পরিচয়ের ভিত্তি নির্ধারণ করেছে ঈমানের ওপর ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি ঈমান আনে…’এই বিশ্বাসই ইসলামের কেন্দ্র। 

অন্যদিকে হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি আমাদের কিবলামুখী হয়, আমাদের জবাইকৃত পশু খায়, সে মুসলিম। 

এই বর্ণনা থেকে আলেমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাহ্যিক ইসলামী পরিচয় বহনকারী কাউকে সহজে কাফের বলা উচিত নয়। 

সব মিলিয়ে বলা যায়, শিয়া সম্প্রদায় একটি বহুমাত্রিক বাস্তবতা যেখানে ইতিহাস, বিশ্বাস ও ব্যাখ্যার ভিন্নতা জড়িয়ে আছে। কিছু গোষ্ঠীর বিশ্বাস ইসলামের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় তারা কঠোর সমালোচিত, আবার অনেক গোষ্ঠী রয়েছে যারা ইসলামি পরিসরের ভেতরেই অবস্থান করে, যদিও তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। 

এই জটিল বিষয়টি বোঝার জন্য প্রয়োজন সংযম, গভীর জ্ঞান এবং ন্যায়ভিত্তিক বিশ্লেষণ যেখানে আবেগ নয় বরং প্রমাণ ও ভারসাম্যই হবে মূল ভিত্তি। 

সংগৃহীত: 


তথ্যসূত্র: মিনহাজুস সুন্নাহ (ইবনু তাইমিয়্যা), সিয়ারু আ’লামিন নুবালা (ইমাম যাহাবী), ফাতহুল বারী (ইবনু হাজার আসকালানী), (সহিহ বুখারি, মুসলিম), (সূরা নিসা ১৩৬) 




  বিষয়:   শিয়া সম্প্রদায়  শিয়া কি মুসলিম  ইসলামি মতপার্থক্য  আহলে বাইত  ইমাম আবু হানিফা  ইবনু তাইমিয়্যা  ইসলামি আকিদা 



Loading...
Loading...


ধর্ম এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy