
X
অবহিতকরণ সভা
ক্ষুদ্রঋণ খাতে গ্রাহক-কণ্ঠ, নীতি ও সেবার সেতুবন্ধন জোরদারের আহ্বান প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নকে আরও গতিশীল ও গ্রাহকবান্ধব করতে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি (এমআরএ) কক্সবাজারের রামু উপজেলায় গণশুনানি ও তথ্য অধিকার বিষয়ক জনঅবহিতকরণ সভার আয়োজন করা হয়।
আজ অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচি মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও নীতি নির্ধারণের মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই আলোচনা সভায় কোস্ট ফাউন্ডেশন এবং ইয়ং পাওয়ার ইন সোস্যাল এ্যাকশান (ইপসা)-এর ৬০ জন ঋণগ্রহীতা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীরা সরাসরি তাদের অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন, যা এমআরএ’র জন্য ক্ষুদ্রঋণ খাতের বাস্তবচিত্র অনুধাবনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এমআরএ’র এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। সভাটি সঞ্চালনা করেন যুগ্ম-পরিচালক জনাব নাজনীন সুলতানা এবং স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন পরিচালক জনাব মুহাম্মদ শহিদুল ইসলাম। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম-পরিচালক জনাব রনজিত কুমার সরকার, উপপরিচালক জনাব সৈয়দ আশিক ইমতিয়াজ, সহকারী পরিচালক জনাব মোঃ হাসান এবং রোকসানা আক্তার লিজা।
গণশুনানির মূল আকর্ষণ ছিল গ্রাহকদের উন্মুক্ত মতবিনিময়। এতে অংশগ্রহণকারী ঋণগ্রহীতারা ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের ইতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি বিদ্যমান কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার দিকও তুলে ধরেন। আলোচনায় সুপেয় পানির অপ্রতুলতা, আয়রনযুক্ত ও লবণাক্ত পানির সমস্যা বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। এছাড়াও ঋণের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার আরও সহনীয় করা, উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের জন্য সহজ শর্তে ঋণপ্রদান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষায়িত ঋণপণ্য চালু, টিলাভূমিতে নিরাপদ পানির জন্য গভীর নলকূপ স্থাপন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি-সংক্রান্ত আইনি সহায়তা নিশ্চিতকরণ, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যদের জন্য অনুদান সহায়তা বৃদ্ধির দাবি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।
সভায় তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কিত একটি বিশেষ সেশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে এমআরএ’র যুগ্ম-পরিচালক জনাব রনজিত কুমার সরকার বিস্তারিত উপস্থাপনায় তথ্য প্রাপ্তির পদ্ধতি, সময়, এসংক্রান্ত ব্যয়ের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। একই সাথে তথ্য প্রাপ্তিতে অসন্তোষ হলে কী করনীয় সে বিষয়গুলোতে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, “তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা হলে নাগরিকরা আরও সচেতনভাবে সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। এতে সরকারের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এটি সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি মৌলিক উপাদান।”
কোস্ট ফাউন্ডশনের নির্বাহী পরিচালক এম রেজাউল করিম চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে বলেন, “গণশুনানি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি একটি কার্যকর প্রতিক্রিয়া-সংগ্রহের প্রক্রিয়া। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বুঝে সেবা উন্নয়ন এবং টেকসই কার্যক্রম পরিচালনায় এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
অন্যদিকে, ইপসার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোঃ আরিফুর রহমান বলেন, “ অথরিটির এই উদ্যোগের জন্য আমরা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। এ ধরনের জবাবদিহিতামূলক কার্যক্রম ক্ষুদ্রঋণ খাতকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করে তুলবে। শহরকেন্দ্রিক না থেকে প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় এসে গণশুনানির আয়োজন একটি অভিনব ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।” এ সময় রামু অঞ্চলে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে water.org এবং পিকেএসএফ-এর সহযোগিতায় প্রকল্প গ্রহণ এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য ফিজিওথেরাপি সেন্টার স্থাপন করার মতো প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন অংশগ্রহণকারীদের উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্ন ও পরামর্শের প্রেক্ষিতে ক্ষুদ্রঋণ খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়ে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, “ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচলিত অর্থে সম্পূর্ণ সরকারি বা বেসরকারি নয়; বরং এটি একটি মধ্যবর্তী কাঠামো, যেখানে প্রতিষ্ঠানের মুনাফা ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করা যায় না এবং গ্রাহকরাই প্রকৃত অর্থে এর মালিক।”
সমন্বিত উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি উল্লেখ করেন, “ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে—কেউ শিক্ষাখাতে, কেউ সুপেয় পানির ব্যবস্থায় কাজ করলে সামগ্রিকভাবে অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। কেউ উক্ত বিষয়ে প্রকল্প গ্রহণ করলে অথরিটি সামাজিক খাতের আওতায় দ্রুততার সাথে অনুমোদন প্রদান করবে। ”
তিনি আরও জানান, “ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সঞ্চয় সংগ্রহের হার বৃদ্ধি করে একটি টেকসই তহবিল গঠনে এমআরএ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করছে।”
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে তিনি কোস্ট ট্রাস্ট ও ইপসা’র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের সাফল্য কেবল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সামাজিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং টেকসই জীবিকায়ন নিশ্চিত করার একটি কার্যকর মাধ্যম। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
সার্বিকভাবে, রামুতে অনুষ্ঠিত এ গণশুনানি ক্ষুদ্রঋণ খাতে নীতিনির্ধারণ, সেবা উন্নয়ন এবং গ্রাহক-কেন্দ্রিক উদ্যোগ বাস্তবায়নে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।