
X
শারমিন সুলতানা
ক্রিকেটের মাঠ সবসময় আলো ঝলমলে নয়। এখানে যেমন উচ্ছ্বাস আছে, তেমনই আছে দীর্ঘ অপেক্ষা, নিঃশব্দ লড়াই আর না পাওয়ার কষ্ট। শারমিন সুলতানার গল্পটাও ঠিক তেমনই। তার এই ফিরে আসা যেন দীর্ঘ অপেক্ষা, নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম আর অটুট বিশ্বাসের এক অনন্য উদাহরণ।
‘আপনারা কেউ তো খোঁজও নেননি’; সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে এক আলাপে কথাটা বলেছিলেন শারমিন, কিছুটা আক্ষেপ নিয়েই। অভিযোগের সুর না থাকলেও বাস্তবতাটা স্পষ্ট। ২০১৯ থেকে ২০২৬ এই দীর্ঘ সময়ের ভেতরে কতবার যে তাকে ‘শেষ’ ভেবে নেওয়া হয়েছে, তার হিসেব তিনি নিজেও রাখেননি। তবে কে কী বলছে, সেসব নিয়ে মাথা না ঘামালেও শারমিন নিজের কাজ থামাননি।
জাতীয় দলের বাইরে থাকাকালীন সময়টা যে সহজ ছিল না, তা নিজেই স্বীকার করেন এই ব্যাটার, ‘একচুয়ালি আমার তো একসময় মনে হয়েছিল যে আর হবে না। অনেকেই বলত, শুধু শুধু কষ্ট করছিৃ কিছুটা হতাশও ছিলাম।’
তবে সেই হতাশা তাকে পথভ্রষ্ট করেনি, বরং করেছে আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, ‘আমি সবসময় পরিশ্রম করে গেছি। নিজের প্রতি বিশ্বাস রেখেছি। আমার পরিবার আমাকে অনেক সাপোর্ট করেছে। আল্লাহর রহমতে এখন আবার সুযোগ পেয়েছি। এজন্য আলহামদুলিল্লাহ। হয়তো বা ওই সময়টুকু আমার ছিল না।’
সাড়ে ছয় বছরের দীর্ঘ সময়জুড়ে শারমিন নিজেকে প্রস্তুত রেখেছেন। তবে তার জন্য বড় মঞ্চ ছিল না, ছিল না আলোচিত হওয়ার মতো সুযোগও। কিন্তু ছিল ঘাম ঝরানো পরিশ্রম। ছিল প্রতিদিন মাঠে যাওয়ার এক অদম্য অভ্যাস।
শারমিন বলেন, ‘আমি সবসময় পরিশ্রম করে গেছি। আমাদের যে ফিটনেস টেস্ট হয়, সেখানে আমি নিয়মিত ভালো মার্কস নিয়ে পাস করেছি। আমি কখনোই পরিশ্রম থামাইনি। জাতীয় দলের ক্যাম্পে না থাকলেও আমি মাঠে যাওয়া বন্ধ করিনি। আমি কখনো পরিশ্রম থামাই নাইৃ রেজাল্ট আসুক বা না আসুক, আমি লেগে ছিলাম।’
শারমিনের এই ধারাবাহিকতা অবশেষে ফল দিয়েছে। আসন্ন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের দলে জায়গা পেয়েছেন ৩২ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। তবে এই ফিরে আসাটা হঠাৎ করে আসেনি। বরং কয়েক বছর ধরে ঘরোয়া লিগে নিয়মিত ভালো করার ফলই এটি।
শারমিনের ভাষায়, ‘গত কয়েক বছর প্রিমিয়ার লিগে আমি নিয়মিত পারফর্ম করে আসছি। পারফরম্যান্সের দিক থেকে কখনোই শীর্ষ পাঁচের বাইরে যাইনি। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা ইমার্জিং দলের বিপক্ষে সিরিজেও আমরা ভালো খেলেছি। সেখান থেকেই আবার জাতীয় দলের ক্যাম্পে সুযোগ পাই। কয়েকটি ক্যাম্প করার পর অবশেষে দলে জায়গা করে নিতে পেরেছি। রাইজিং স্টার টুর্নামেন্টেও নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ ছিল।’
সাড়ে ছয় বছর আগে ১৩টি ওয়ানডে খেলেছিলেন শারমিন। সেখানে ৯ গড়ে তার রান ছিল মাত্র ১১৫, সর্বোচ্চ ২৭। তবে এখন তিনি নিজেকে নতুনভাবে গড়েছেন। ব্যাটিং স্টাইল, স্ট্রাইক রেট, ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝা সবকিছুতেই এসেছে পরিবর্তন।
শারমিন বলেন, ‘আগের সময়ের তুলনায় এখন আমার মধ্যে অনেক বেশি ম্যাচিউরিটি এসেছে। তখন হয়তো এতটা ম্যাচিউর ছিলাম না। এখন আমি ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটটা অনেক গভীরভাবে দেখি, কী ধরনের পরিবর্তন আসছে সেটা বোঝার চেষ্টা করি এবং সেই অনুযায়ী নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করি। ইনশাআল্লাহ, আমি চাই পারফরম্যান্সের মাধ্যমে সেটা প্রমাণ করতে। এখন আমার লক্ষ্য ভালো স্ট্রাইক রেটে খেলা এবং যেকোনো পজিশনে নেমে দলের জন্য কার্যকর অবদান রাখা। দেশকে ম্যাচ জেতাতে যা করা দরকার, সেটাই করতে চাই।’
দীর্ঘ বিরতির পর দলে ফেরা নিয়ে বাড়তি চাপ নিতে চান না শারমিন, ‘আমি বিষয়টাকে এমনভাবে দেখছি না যে অনেকদিন পর ফিরেছি, তাই আমাকে আলাদা কিছু করতে হবে। আমি আমার স্বাভাবিক খেলার ধরনেই থাকতে চাই। এতদিন ধরে আমি যেভাবে খেলছি, যেভাবে প্র্যাকটিস করছি ডোমেস্টিক লিগ, এ-টিম বা ইমার্জিং টিম সব জায়গায় যেভাবে খেলেছি, সেভাবেই খেলতে চাই। আমি কোনো অতিরিক্ত চাপ নিতে চাই না। আমার লক্ষ্য নিজের স্বাভাবিক খেলাটা ধরে রাখা। ইনশাআল্লাহ, এতে ভালো কিছু হবে আমার জন্যও, দলের জন্যও।’
সময় বদলেছে, বদলেছে দলের পরিবেশ, বদলেছে ক্রিকেটের ধরণও। আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকেও বদলে নিয়েছেন শারমিন। দীর্ঘ সময় ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, ফিটনেস ধরে রাখা এবং অনুশীলনের প্রতি নিষ্ঠাই তাকে এনে দিয়েছে নতুন এক প্রত্যাবর্তনের সুযোগ, যেন আরেকটি ‘অভিষেকের অপেক্ষা’।