
X
গত ৫ এপ্রিল থেকে হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে
স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সন্দেহজনক হাম রোগে বুধবার পর্যন্ত গত এক মাসে ১৬৬টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং এ সময়ে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজারের বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম পরিস্থিতি বাংলাদেশে এখন অনেকটা প্রাদুর্ভাবের রূপ ধারণ করেছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় আইসোলেশন ওয়ার্ড ও আইসিইউ সুবিধা প্রস্তুত করার কথা জানিয়েছে সরকার।
যদিও দেখা যাচ্ছে, হাম শুধু বাংলাদেশই না, বরং যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার মতো উন্নত দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যেই সতর্ক করে বলেছে, টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় বিশ্বের কিছু অঞ্চলে আবার হাম রোগের পুনরুত্থান দেখা যাচ্ছে।
চিকিৎসা বিষয়ক জার্নাল দ্য ল্যানসেট এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক হাম প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের মতো নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে টিকার ঘাটতির কারণে হাম প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি তৈরি হলেও উন্নত বিশ্ব কিংবা বিশ্বজুড়ে নানা দেশে হামে আক্রান্ত হওয়ার পরিমাণ বাড়ছে কেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড মহামারীর সময়ে সারাবিশ্বেই শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ব্যাঘাতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে টিকাবিরোধী প্রচারণাও বেড়েছে, যা হাম সংক্রমণ ফিরে আসার পথ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশেও হাম ফিরে আসার জন্য ঠিকমতো টিকা দিতে না পারাকেই দায়ী করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল।
তিনি বলেছেন, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির পর আবার চার বছর পরপর একই কর্মসূচি হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি।
ফলে বহু শিশু পরবর্তীতে টিকার বাইরে থেকে গেছে এবং টিকা সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ৫ই এপ্রিল থেকে হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে, যেখানে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী টিকাদানের ঘাটতির কারণে ২০২৩ সালে ৫৭টি দেশে বড় বা গুরুতর হাম প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। এটি আগের বছরে ৩৬টি দেশের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কার্যক্রমের আওতাধীন আফ্রিকান, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয়, ইউরোপীয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আক্রান্তের সংখ্যায় ব্যাপক বৃদ্ধি দেখা গেছে। এই প্রাদুর্ভাবের প্রায় অর্ধেকই দেখা গেছে আফ্রিকা অঞ্চলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড মহামারির সময়ে বিশ্বজুড়ে সার্বিক টিকাদান কর্মসূচিতে যে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটেছিল তারই বহিঃপ্রকাশ হলো হামের মহামারি কিংবা মহামারির মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া।
এছাড়া টিকার কার্যকারিতা হ্রাস কিংবা ভাইরাসের নতুন ধরন তৈরি হয়েছে কি-না সেই প্রশ্নও উঠছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দেশে টিকাবিরোধী প্রচারণাও হামকে প্রবল বেগে ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছে কি-না সেই আলোচনাও আছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত বছর ২৮শে নভেম্বর যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল যেখানে বলা হয়েছিল, ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে হাম রোগীর আনুমানিক সংখ্যা ৭১ শতাংশ কমে ৩৮ মিলিয়ন (তিন কোটি ৮০ লাখ) থেকে ১১ মিলিয়নে (এক কোটি ১০ লাখ) নেমে এসেছে।
একই সময়ে, হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ৮৮ শতাংশ কমে সাত লাখ ৭৭ হাজার থেকে ৯৫ হাজারে দাঁড়ায়।
ল্যানসেট বলছে, এই অগ্রগতি মূলত দুই ডোজের হাম টিকাদানের হার বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রথম ডোজের টিকার বৈশ্বিক কভারেজ ২০০০ সালের ৭১ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৮৪ শতাংশে উন্নীত হয়। পাশাপাশি টিকার দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ ওই একই সময়ে ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৬ শতাংশে পৌঁছায়।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সিডিসি বলছে, ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হাম নির্মূল ঘোষণা করা হলেও, টিকা না নেওয়া আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের কারণে দেশটিতে এখনো হাম রোগের সংক্রমণ ও প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে।