
X
মিরপুর শেরেবাংলায় গ্যালারির এই অংশে ছাউনি চান দর্শকেরা।
সূর্য তখন মধ্য গগণে। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ইস্টার্ন গ্যালারিতে পাশাপাশি বসে খেলা দেখছিলেন তিন দর্শক। ‘এত গরমে এখানে কিভাবে বসে আছেন?’ প্রশ্ন শেষ না হতেই একজন বলে উঠলেন, “এখানে খেলা দেখা অনেক কষ্টকর। গরমে বসে থাকা যায় না ভাই। ছাউনিটা থাকলে ভালো হয়- পানির দামও অনেক বেশি।’
মনের খোরাক মেটাতে খেলা দেখতে এসে শরীরিক অবস্থা তাদের বেহাল। ঘেমেনেয়ে একাকার, কণ্ঠে হতাশা আর ক্ষোভ। বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচ চলাকালীন এমন অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন আরও বেশ কয়েকজন দর্শক।
সিরিজ শুরুর আগের দিন বিসিবির এক ভিডিও বার্তায় সংস্থার সভাপতি ও সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল জানান, মাঠে আসা দর্শকদের অভিজ্ঞতাকে আনন্দময় করে তোলা নিয়ে কাজ করতে চান তারা। দর্শকদের মাঝ থেকে ৫-১০ জনকে বাছাই করে তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন বিসিবি প্রধান। শুনবেন দর্শকদের অভিজ্ঞতা, সুবিধা-অসুবিধার কথা।
এছাড়া বিসিবির কর্মীরাও বিভিন্ন সময় গ্যালারিতে গিয়ে কথা বলবেন দর্শকদের সঙ্গে। দর্শকদের সুবিধা-অসুবিধার কথা শুনে এসব তারা তুলে ধরবেন সভাপতির কাছে। দর্শকদের খেলা দেখার অভিজ্ঞতাকে স্মৃতিময় করে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন তামিম।
তবে তার এই কথাগুলি অনেক দর্শকের দুয়ারে পৌঁছায়নি এখনও। প্রথম ম্যাচ দেখতে আসা বেশ কজন দর্শকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাদের প্রায় কেউই জানেন না বিসিবি সভাপতির এই উদ্যোগের কথা। তবে তারা স্বাগত জানালেন বোর্ড প্রধানের এই পদক্ষেপকে।
তীব্র রোদে ছাদধীন গ্যালারিতে বসে খেলা দেখার ভোগান্তির কথা যেমন অনেকে বললেন, আবার খাবার ও পানির বাড়তি দাম নিয়েও অভিযোগ করলেন কেউ কেউ। বিসিবির প্রতি জানালেন তারা কিছু অনুরোধ।
মিরপুর ১১ নম্বর থেকে খেলা দেখতে আসা মোহাম্মদ সাজ্জাদ ক্ষোভ প্রকাশ করলেন পানির বাড়তি দাম নিয়ে। “পানি এক গ্লাস বিক্রি করছে ১০ টাকা, বোতল দুই লিটার ১০০ টাকা। দুই নম্বরি করছে এরা। ৫ টাকা, ১০ টাকা বেশি নিলে ঠিক আছে। এটা মেনে নিব। কিন্তু ৪০ টাকার জিনিস ১০০ টাকা নিচ্ছে। আমাদের ঘাম ঝরানো টাকা, আমাদের কষ্টের টাকা এটা। বিসিবির কাছে আমাদের অভিযোগ, পানির দাম বেশি নিচ্ছে। তামিম ইকবালের কাছে একটাই অনুরোধ আছে, সব কিছু যেন নিয়ন্ত্রণ করা হয়।”
এখন ম্যাচের টিকেট পাওয়া যায় অনলাইনেই। চন্দ্রার পল্লীবিদ্যুৎ থেকে একসঙ্গে খেলা দেখতে এসেছেন পাঁচ জন। কিন্তু তারা কেউ অনলাইনে টিকেট করেননি। এখানে এসে ইস্টার্ন গ্যালারির ২০০ টাকা দামের টিকেট তারা কালোবাজারে কিনেছেন ৩০০ টাকা করে।
তাদের একজন মোহাম্মদ জনি ইসলাম বললেন, “এখানে এসে টিকেট পাওয়াটা একটু কষ্টসাধ্য হয়ে গেছে। টিকেট বিভিন্ন দামের আছে। সবাই তো সব ধরনের টিকেট কিনতে পারে না, যার যেমন সামর্থ্য সে অনুযায়ী কিনেছে। আমরা এখানে এসে বিভিন্ন বিভ্রান্তিতে ছিলাম। একেকজন একেকরকম দাম বলছিল। অনেক কষ্টে টিকেট পেয়েছি আমরাৃ ব্ল্যাকে (কালোবাজারে), প্রতি জনের টিকেটের দাম ৩০০ টাকা করে নিয়েছে।”
স্টেডিয়ামের সবচেয়ে কম মূল্যের গ্যালারি যেটি, যেখানে দর্শক হয় সাধারণ সবচেয়ে বেশি সেটির ওপরে সেই কোনো ছাদ বা শেড। নিয়মিত ক্রিকেট মৌসুমে খুব একটা সমস্যা হওয়ায় আবহাওয়া পক্ষে থাকে বলে। তবে এই বৈশাখের তীব্র গরমে এই গ্যালারির দর্শকেরা নাজেহাল।
“আমরা যারা খোলা জায়গার মধ্যে আছি, রোদে অনেক কষ্ট হয় আসলে। যদি এখানে ছাউনির ব্যবস্থা করা হয় তাহলে আমাদের জন্য ভালো হয়। সাধারণ দর্শক এখানে এসে খেলা উপভোগ করতে পারবে। খেলা দেখতে আসছি, মনে আনন্দ আছে বলে রোদ কিছু মনে হচ্ছে না, কিন্তু শরীরের জন্য তো ক্ষতি। শরীরে কুলাচ্ছে না, অনেক কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
“প্রতিটা গ্যালারিতে ছাউনি দেওয়া উচিত। রোদ-বৃষ্টিতে খেলা দেখা আসলে কষ্ট হয়ে যায়। যদি ছাউনির ব্যবস্থা করা হয়, টিকেটের দাম আরেকটু কমানো হয়, তাহলে দর্শকের উপস্থিতি আরও বাড়বে।”
খাবারের দাম নিয়ে অসন্তুষ্টির কথা তুলে ধরলেন জনি, “খাবার এখানে ভেতরে চড়া দাম, অনেকের সাধ্যের মধ্যে নেই। আমরা খেলা দেখতে আসছি, যদি বাইরে খাবার পাই কম দামে তাহলে খাব, না হলে অনাহারেই থাকতে হবে। মনের আনন্দে খেলা দেখতে আসছি, এটাই অনেক কিছু।”
গ্যালারির বিভিন্ন ব্লকে পাওয়া যাচ্ছে খাবার। প্রতিটি চিকেন রোল, স্যান্ডউইচের দাম ধরা হচ্ছে ৮০ টাকা। চিকেন বার্গার ১২০ টাকা। তবে একেক জায়গায় দাম কিছুটা কম-বেশি আছে। উত্তরা থেকে আসা আব্দুল হকও অভিযোগ করলেন খাবারের দাম নিয়ে, “খাবারের দাম অনেক বেশি। বাইরে যেটার দাম ২০ টাকা, এখানে সেটা ৪০ টাকা। চিপসের দাম ১০টাকা হলে এখানে ২০টাকা। খাবারের দামটা কমানো উচিত।”
“মূল সমস্যা হলো রোদ। এই পাশে (ইস্টার্ন গ্যালারি) ছাউনি নেই। অন্য পাশে আছে। এই পাশে ছাউনি দিলে ভালো হয়। এখানে খেলা দেখা অনেক কষ্ট হচ্ছে। গরমে বসে থাকা যায় না। ছাউনিটা হলে আরামদায়ক হয়।” ইস্টার্ন গ্যালারিতেই আছে স্টেডিয়ামের বড় পর্দা। সেটির ছায়ায় গাদাগাদি করে বসে খেলা দেখতে দেখা যায় অনেক দর্শককে।
বড় পর্দার পাশে দাঁড়ানো মোহাম্মদ হৃদয় বললেন, “এই গ্যালারিতে ছাদ নেই, ছাদ দিলে ভালো হতো। গরমে কষ্ট হয়। বৃষ্টিতেও সমস্যা হবে, দাঁড়ানো যাবে না এখানেৃ খাবারের দাম বেশি, পানির দাম অতিরিক্ত বেশি। দুই লিটারের পানির বোতল ১০০ টাকা নিচ্ছে। আর ছোট গ্লাস ১০ টাকা।”
হেমায়েতপুর থেকে আসা তাওসিফও বললেন একই কথা, “পানির দাম বেশি। দুই লিটার পানি ১০০ টাকা, আবার সময় দেখে দেড়শ টাকা নিচ্ছে। খাবারের দাম সবগুলোই বেশি। দাম কমিয়ে দিলে আমাদের জন্য সুবিধা হয়ৃ আজ রোদ বেশি। আমরা সিটে বসিনি। এখানে দাঁড়িয়ে আছি, ছাউনি দিলে আমাদের জন্য ভালো হয়।”
তাওসিফের পাশেই থাকা আফজাল হোসেনের চাওয়া, “স্কোরবোর্ড ফাঁকা রেখে বাকি জায়গায় ছাউনি দিলে সবার অনেক উপকার হতো।”
নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিংয়ের সময় গ্যালারিতে দর্শক সংখ্যা কম থাকলেও, বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সময় তা বেড়ে যায়। তীব্র রোদের কারণে ছাদহীন গ্যালারিতে অনেককেই দেখা যায় দাঁড়িয়ে খেলা দেখতে। কেউ খুঁজে নিচ্ছিলেন একটু ছায়া। অতীতে টয়লেট নিয়ে অনেক অভিযোগ থাকলেও, এবার এখনও পর্যন্ত তা অনেকটা কম। ইনিংস বিরতির সময় কয়েকটি গ্যালারির টয়লেটে গিয়ে খুব বেশি অপরিষ্কার দেখা যায়নি। দর্শকদের কেউ কেউ বেসিনের ওপরে পা ধোয়ায় মেঝেতে পানি জমে ছিল কিছু জায়গায়।
গাবতলী থেকে আসা সাজ্জাদ বললেন, ‘একবার গিয়েছিলাম টয়লেটে। একটু পানি জমে ছিল। তাছাড়া খুব একটা খারাপ নয়। মাঝে মধ্যে পরিষ্কার করলে ভালো হয়।” একই সুর ফার্মগেট থেকে আসা সুমন হোসেনের কণ্ঠেও, “টয়লেট মোটামুটি ঠিক আছে, আরেকটু পরিষ্কার হলে ভালো হতো।”
সুমনেরও অভিযোগ মূলত পানির দাম নিয়ে, “এত বেশি দাম নিচ্ছে এরা, ২০ টাকার বোতল ৪০ টাকা নিচ্ছে। হয়তো ৫টাকা বেশি নিতে পারত। কিন্তু দ্বিগুণ!” সুমনের সঙ্গে কথা বলার সময়ই এক জায়গায় দেখা গেল দর্শকদের হট্টগোল। সেখানেও মূলত পানির বাড়তি দাম নিয়ে দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তির সঙ্গে বাকবিতণ্ডা চলছিল তাদের। সেখানে প্রথমে দুই লিটারের পানির বোতল ১০০ টাকা বিক্রি হলেও, পরে কমিয়ে দেওয়া হয় দাম। তখন পানি নিয়ে দৌড়াতে দেখা যায় কয়েক জনকে।
পরে অবশ্য গ্যালারিতে ফ্রি পানির ব্যবস্থা করতে দেখা যায় বিসিবির পক্ষ থেকে। দর্শকদের সঙ্গে কথা বললে এসব অভিযোগ বিসিবি সভাপতিরও কানেও পৌঁছার কথা। যুগ যুগ ধরেই অবশ্য চলে আসছে এসব অভিযোগের ডালি। সময় বলবে, নতুন বোর্ডের সময় দর্শকদের অভিজ্ঞতা কতটা নতুন হবে।