
X
শাহরিয়ার নাঈম
এক সময় সাংবাদিকতা ছিল কেবল একটি পেশা নয়, এটি ছিল নৈতিকতা, সাহস এবং ত্যাগের প্রতীক। সত্য তুলে ধরার জন্য অনেকেই ব্যক্তিগত ক্ষতির স্বীকার হয়েছেন; চাকরি হারানো, কারাবরণ কিংবা জীবনের ঝুঁকি নেওয়া ছিল অস্বাভাবিক কিছু নয়। সংবাদ পরিবেশন মানেই ছিল সত্যের প্রতি অটল অঙ্গীকার।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই চিত্রে এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এবং তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ সাংবাদিকতাকে এক নতুন বাস্তবতায় দাঁড় করিয়েছে। এখন অনেক ক্ষেত্রেই সংবাদ পরিবেশনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ‘ভিউ’, ‘রিচ’ এবং ‘ট্রেন্ড’। ফলে খবরের গভীরতা নয়, বরং শিরোনামের আকর্ষণই হয়ে উঠছে মূল ফোকাস।
সত্য বনাম গতি: এক অসম লড়াই
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে টিকে থাকার জন্য এখন ‘ব্রেকিং নিউজ’ দেওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। অনেক সময় তথ্যের সত্যতা যাচাই করার আগেই তা প্রকাশ করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে বিভ্রান্তি ও ফেক নিউজ।
তথ্যের গভীরতা: আগে একটি রিপোর্টের পেছনে কয়েকদিন সময় ব্যয় করা হতো। এখন কয়েক মিনিটের মধ্যে খবর প্রকাশ না করলে তা ‘পুরোনো’ হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত সংবাদ প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি, কিন্তু গুণগত মান ও সঠিক তথ্য এখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ- যাতে দর্শক বা পাঠক বিভ্রান্ত না হয়।
ক্লিকবেইট সংস্কৃতি: চমকপ্রদ শিরোনাম দিয়ে পাঠককে আকৃষ্ট করার প্রবণতা সাংবাদিকতার গাম্ভীর্য নষ্ট করছে। অনেক ক্ষেত্রে খবর উপস্থাপনের সময় তা অতিরঞ্জিত করা, আংশিক তথ্য দেওয়া কিংবা প্রাসঙ্গিক তথ্য গোপন রাখার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়। এর ফলে সংবাদমাধ্যমের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
কনটেন্টের জোয়ারে হারিয়ে যাচ্ছে কি নৈতিকতা?
একজন পেশাদার সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব হলো জনস্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু বর্তমানের ‘অ্যালগরিদম নির্ভর’ সাংবাদিকতায় জনস্বার্থের চেয়ে পপুলিজম বা জনপ্রিয়তা বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। ভাইরাল হওয়ার নেশায় অনেক সময় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা মানবিক সংবেদনশীলতাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। এটি একটি মৌলিক অধিকার হলেও, এর সাথে জড়িত রয়েছে দায়িত্ববোধ। “Freedom of speech” কখনোই সীমাহীন নয়; প্রতিটি সমাজ, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রের নিজস্ব সংবেদনশীলতা ও সীমারেখা থাকে। উন্নত বিশ্বেও নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। তাই মতপ্রকাশের নামে দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য প্রদান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
শুধু সাংবাদিকতা নয়, সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও একই ধরনের নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র দেখা যায়। প্রতিটি পেশাতেই কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোর ওপর, যেখানে আস্থার সংকট দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে।
নাগরিকের ভূমিকা
এই পরিস্থিতিতে সচেতন নাগরিকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সত্য বলা এবং সঠিক তথ্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এখন আর কেবল সাংবাদিকদের দায়িত্ব নয়; এটি হয়ে উঠেছে সবার সম্মিলিত কর্তব্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে প্রত্যেক ব্যক্তি এখন নিজস্ব প্ল্যাটফর্মের মালিক, ফলে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।
উত্তরণের পথ কী?
প্রযুক্তিকে অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি সাংবাদিকতার মূল নীতিগুলোকেও আঁকড়ে ধরতে হবে।
ফ্যাক্ট-চেকিং: কোনো সংবাদ প্রকাশের আগে একাধিক সোর্স থেকে তা নিশ্চিত করা।
মানসম্পন্ন ফিচার: কেবল সংবাদের পেছনে না ছুটে বিশ্লেষণধর্মী এবং গবেষণামূলক প্রতিবেদনের ওপর জোর দেওয়া।
নৈতিকতা: সেনসেশনালিজম এড়িয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করা।
বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন করতে হলে প্রয়োজন সততা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি তথ্য এবং প্রতিটি মতামতের পেছনে থাকতে হবে সত্যের প্রতি আন্তরিকতা। কারণ সমাজে আস্থা ফিরিয়ে আনার একমাত্র পথ হলো নির্ভরযোগ্য ও সৎ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা।
তবে এই পথ সহজ নয়। ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠান সবাইকে এই দায়িত্ব নিতে হবে। ন্যায়, বিবেক ও সাহসিকতার সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি সুস্থ তথ্যভিত্তিক সমাজ।