
X
বড় স্তন কী নারীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ায়?
বড় আকৃতির স্তনকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আকর্ষণীয় বলে মনে করা হলেও বাস্তবতা হতে পারে ভিন্ন, কখনো বা কঠিন। এটি নারীদের স্বাস্থ্য ও জীবনমানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
আর্জেন্টিনার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাকেল ২০১০ সালে অস্ত্রোপচার করে স্তনের আকৃতি ছোট করার সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে রাকেলের বয়স ৫২।
তিনি বলেন, ওই সিদ্ধান্তের ফলে তিনি পান এক ধরনের 'মুক্তির অনুভূতি' যা আগে তার ছিলো না।
অতিরিক্ত বড় স্তনের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী পিঠের ব্যথা, ঘন ঘন মাথাব্যথা, দেহভঙ্গির সমস্যা, অবশতা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি।
ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব এস্থেটিক প্লাস্টিক সার্জারির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে স্তন ছোট করার অস্ত্রোপচার হয়েছে ৬ লাখ ৫২ হাজার ৬৭৬টি। সবচেয়ে বেশি অস্ত্রোপচার হয়েছে ব্রাজিলে (১ লাখ ১৫ হাজার ৬৪৭টি)। এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র (৬৭ হাজার ৪৭৮টি), ফ্রান্স (৩৮ হাজার ৭৮০টি), জার্মানি (৩২ হাজার ৬৮টি), তুরস্ক (২৫ হাজার ৩৩৪টি) ও ভারতের অবস্থান (২২ হাজার ৪০০টি)।
রাকেল বলেন, যখন কৈশোরে ছিলেন তখন থেকে ভারী বুকের কারণে তীব্র পিঠ ব্যথায় ভুগতেন তিনি।
কিন্তু আর্জেন্টিনায় বড় স্তন থাকাকে আশীর্বাদ বলেই মনে করা হয়। বিষয়টির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রাকেল বলেন, অধিকাংশ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা বলতেন- তুমি খুব ভাগ্যবান।
আসলে তিনি এখনো পিঠের ব্যাথায় ভুগছেন, এর কারণ মূলত শরীরকে লোকচক্ষু থেকে আড়ালের চেষ্টা করতে গিয়ে হাঁটার ধরনেই পরিবর্তন এনেছিলেন তিনি।
কর্মঠ মানুষ হিসেবে রাকেল ইয়োগা, পাইলেটস ও জিমে যাওয়া পছন্দ করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত বড় স্তনের চাপ তার চলাফেরায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে তিনি পছন্দের এসব কার্যকলাপ থেকে সরে আসতে বাধ্য হন।
ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাসথেটিক প্লাস্টিক সার্জনসের প্রেসিডেন্ট ডা. নোরা নুজেন্ট বলেন, যারা স্তন ছোট করতে চান তাদের কাছ থেকে দুটি অভিযোগ সবচেয়ে বেশি শোনা যায়- ব্যায়াম করতে অসুবিধা ও চলাফেরা করতে সমস্যা।
তার মতে, বড় স্তন স্বাভাবিকভাবে ভারী হয়। এর ফলে শরীর সামনে দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং পিঠ ও ঘাড়ে সারাক্ষণ চাপ তৈরি হয়। বুক ভারী হলে ব্যায়াম করা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে এবং ঠিকমতো সাপোর্ট দেয় এমন ব্রা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়।
রাকেল বলেন, স্তন ঠিকভাবে ধরে রাখার জন্য তাকে একসঙ্গে "দুই বা তিনটি" ব্রা পরতে হতো। বড় মাপের ব্রার দাম বেশি যা অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ডা. নোরা নুজেন্ট বলেন, যুক্তরাজ্যে সাধারণত স্তন ছোট করার অস্ত্রোপচারে একেকটি স্তন থেকে ৫০০ থেকে ৮০০ গ্রাম পর্যন্ত কমানো হয়। যদিও তিনি এর থেকেও বেশি গ্রাম কমাতে দেখেছেন।
বিষয়টির ব্যাখ্যা দিতে তিনি বলেন, শরীরের মোট ওজনের তুলনায় এটি খুব বেশি মনে নাও হতে পারে, কিন্তু শরীরের একটি নির্দিষ্ট অংশের জন্য এটি পরিমাণে বেশি হয়ে যেতে পারে।
অনেক দিন ধরে স্তনের ব্যথায় ভুগছিলেন অধ্যাপক জোয়েনা ওয়েকফিল্ড। তিনি যখন বিষয়টি নিয়ে তার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে যান, তখন তাকে শুধু একটি ভালো মাপের ব্রা পরার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বায়োমেকানিক্সের বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ভালো ব্রা আসলে কোনটিকে বলে সেটি নিয়ে গবেষণা করবেন।
তিনি বলেন, আমি বুঝতে পারলাম, কেন আমাদের ব্রা দরকার, ব্রার উপকারিতা কী, ব্রার কার্যকারিতা কেমন হওয়া উচিত-এসব বিষয়ে আমরা আসলে খুব কমই জানি।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঠিক মাপের ব্রা না পরার কারণে ব্যথা বাড়তে পারে, ত্বক ও টিস্যুর ক্ষতি হতে পারে, শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক ছন্দ বদলে দিতে পারে এবং শারীরিক কার্যকলাপে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। আসলে ভারী স্তনের প্রভাব পুরো শরীরের কার্যকারিতার ওপর কিছুটা প্রভাব ফেলে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বছরের পর বছরের গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ওই দল আরও খুঁজে পেয়েছে যে সব ধরনের ব্যায়ামের সময় স্তন আট সংখ্যার প্যাটার্নের মতো নড়াচড়া করে।
গবেষণা করে তারা বের করে করেছেন, স্তনের ব্যথা কমানোর মূল চাবিকাঠি হলো ধীরে চলাচল বা নড়াচড়া করা। বেশি নড়াচড়া বা কম নড়াচড়া করার সাথে স্তন ব্যথা বেশি বা কম হওয়ার সম্পর্ক কম।
সূত্র: বিবিসি বাংলা