গতিময় ইয়র্কারটি কোনোরকমে ঠেকাতে পারলেন নিউজিল্যান্ডের শেষের সারির ব্যাটসম্যান ন্যাথান স্মিথ। স্পিডগানে ধরা পড়ল বলের গতি, ১৪৫.৪ কিলোমিটার। কে বলবে, নাহিদ রানার দশম ওভারের শেষ ডেলিভারি ছিল সেটি! শেষের একটি ডেলিভারি আগেই ১৪৪.১ কিলোমিটার গতির আরেকটি ইয়র্কার করেছেন। এই প্রচণ্ড গরমেও একজন ফাস্ট বোলার এমন গতির ঝড় তুলছেন, নিজের শেষ ওভারেও সেই গতি ধরে রাখছেন, অতিমানবীয় বললেও যেন কম বলা হয়।
বৈশাখের খরতাপে প্রকৃতি যেন ঝলছে যাচ্ছে এখন। তবে এর চেয়েও বেশি তেজ যেন নাহিদ রানার বোলিংয়ে। সেই আগুনে পুড়ে খাক নিউ জিল্যান্ডের ব্যাটিং। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৩২ রানে তার শিকার ৫ উইকেট।
এটিও অবশ্য তার সেরা বোলিং নয়। গত মাসেই পাকিস্তানের বিপক্ষে ২৪ রানে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন এই মিরপুরেই। ক্যারিয়ারের প্রথম ১০ ওয়ানডেতেই একাধিকবার ৫ উইকেটের কীর্তি আছে বাংলাদেশের আর কেবল মুস্তাফিজুর রহমানের।
তবে স্রেফ উইকেট সংখ্যা বা দারুণ অর্জনের কথা বললেও বলা হয় না কিছুই। বাংলাদেশের একজন ফাস্ট বোলার ব্যাটসম্যানদের গতিতে কাঁপিয়ে দিচ্ছেন, বাউন্সারে নাড়িয়ে দিচ্ছেন, ইয়র্কারে নুইয়ে দিচ্ছেন, এ দেশের ক্রিকেট অনুসারীদের জন্য কী আনন্দময় দৃশ্য!
নাহিদ অবশ্য এরকম কিছু আগেও দেখিয়েছেন। এবারের পারফরম্যান্স তবু স্পেশাল কন্ডিশনের কারণে। সকাল ১১টায় শুরু ম্যাচে প্রচণ্ড রোদে পরিবেশ একরকম অসহনীয়। ফাস্ট বোলারদের তো শরীরের ওপর ধকল যায় আরও বেশি। কিন্তু নাহিদকে যেন স্পর্শ করতে পারেনি কিছ্।ু ক্লান্তি-শ্রান্তি তাকে কাবু করতে পারেনি। প্রতিটি ডেলিভারিতেই ঢেলে দিয়েছেন নিজের সবটুকু।
ফাস্ট বোলারদের জন্য এমনিতে নতুন স্পেলে ছন্দ পেতে শুরুতে কিছুটা সময় লাগে। অথচ নাহিদ এ দিন প্রতিটি স্পেলেই প্রথম ওভারে নিয়েছেন উইকেট। ১টি ওয়াইডসহ যে ৬১টি ডেলিভারি তিনি করেছেন এই ম্যাচে, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, স্রেফ একটি স্লোয়ার ডেলিভারি (১১২ কিলোমিটার) ছাড়া বাকি সব ডেলিভারি ছিল ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতির। এই কন্ডিশনে স্রেফ অবিশ্বাস্য।
সেই গতি স্রেফ গতিময়তার জন্যই নয়, দারুণ কার্যকরও ছিল। ৫ উইকেটে তো সেটিরই প্রমাণ। ইনিংসের শুরু, মাঝামাঝি এবং শেষে, সব পর্যায়েই ছোবল দিয়েছেন তিনি কিউই ব্যাটিংয়ে। গতি আর বাউন্স তো বরাবরই তার সম্পদ, এই ম্যাচে দেখালেন, ইয়র্কারেও হাত পাকিয়ে নিচ্ছেন দ্রুতই।
আগের ম্যাচটিতে খুব ভালো ছিল না তার পারফরম্যান্স। ১টি উইকেট জুটেছিল ৬৫ রান দিয়ে। এ দিন তার শিকারের শুরু বল হাতে নিয়েই। অষ্টম ওভারে আক্রমণে আনা হয় তাকে। নিউ জিল্যান্ডের উদ্বোধনী জুটি তখনও অবিচ্ছিন্ন। প্রথম বলেই নাহিদের ফুল লেংথ ইনসুইঙ্গারে এলবিডব্লিউ হেনরি নিকোলস।
পরের ওভারের প্রথম বলেই উইকেট আরেকটি। এবার লেংথ থেকে বাড়তি লাফানো বল উইল ইয়াংকে চমকে দিয়ে ছোবল দেয় ব্যাটের ওপরের দিকে। সহজ ক্যাচ যায় পয়েন্টে। ৫ ওভারের প্রথম স্পেলে ১০ রান দিয়ে উইকেট ছিল তার ২টি।
দ্বিতীয় স্পেলে যখন ফিরলেন, নিক কেলি ও মুহাম্মাদ আব্বাসের জুটি তখন বাংলাদেশের মাথাব্যথা হয়ে উঠছে। নাহিদ ফিরে প্রথম ওভারেই ভাঙেন ৫৬ রানের জুটি। আর সেই উইকেটে বড় অবদান অবশ্য লিটন কুমার দাসের। নাহিদের বাউন্সারে পুল করার চেষ্টায় গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি আব্বাস। অনেকটা পেছনে ছুটে দুর্দান্ত ক্যাচ নেন শততম ওয়ানডে খেলতে নামা কিপার।
ওই স্পেলে ৩ ওভারে রান দেন ১০। আবার তিনি ফেরেন ৪৩তম ওভারে। এবার ১৪৪ কিলোমিটার ছাড়ানো গতির শর্ট বলে বিদায় নেন কিউইদের আগের ম্যাচের নায়ক ডিন ফক্সক্রফট। নিজের শেষ ওভারটি করতে আসেন একটু পর। এবার আর শর্ট বল নয়, তার নিখুঁত ইয়র্কারে বোল্ড বাঁহাতি জেডন লেনক্স।
নিউজিল্যান্ড একসময় আড়াইশর আশেপাশে যেতে পারে বলে মনে হচ্ছিল। নাহিদের একেকটি স্পেল তাদেরকে দমিয়ে দেয় বারবার। শেষ পর্যন্ত গুটিয়ে যায় তারা ১৯৮ রানেই। নাহিদ রানা বল উঁচিয়ে ধরে মাঠ থেকে বেরিয়ে আসেন হাসিমুখে। সেই হাসিতে মিশে থাকল যেন গোটা বাংলাদেশ ক্রিকেটের খুশি।