
X
১৭ দিন পর জীবিত বের করা হয় রেশমা বেগমকে
সাভারে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় এক হাজার ১৩৮ পোশাকশ্রমিকের করুণ মৃত্যু ঘটে। এ ঘটনায় আহত হন প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক আর স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেন এক হাজার ১৬৯ জন।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ওই ভবন ধসের ঘটনায় পুরো বিশ্ব স্তম্ভিত হলেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করতে ‘রেশমা উদ্ধার নাটক’ তৈরি করে। ঘটনার ১৭ দিন পর ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় পোশাকশ্রমিক রেশমা ওরফে ফাতেমাকে উদ্ধারের ঘটনা সামনে আনে। এমন তথ্য উঠে এসেছে সরকারের একটি নথিতে।
রেশমা উদ্ধার নাটকের সঙ্গে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব জড়িত থাকার সুস্পষ্ট তথ্যপ্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন সরকারের মঞ্জুরিপত্র না পাওয়ায় অভিযোগপত্র থেকে তা বাদ দেওয়া হয় বলেও এ নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে ঘটনার ১৩ বছর পরও মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া, প্রভাবশালী আসামিদের জামিনে মুক্ত হয়ে পালিয়ে যাওয়া এবং মামলার স্বাভাবিক কার্যক্রমে আওয়ামী লীগ সরকারের হস্তক্ষেপের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা আমার দেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বিভিন্ন নথিপত্র, প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, রানা প্লাজা ধসের দিনই অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে রানা প্লাজা থেকে বেরিয়ে প্রাণে রক্ষা পান দিনাজপুরের মেয়ে রেশমা। ১৭ দিন পর ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে রেশমাকে উদ্ধারের ঘটনা প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করার হীনচেষ্টা বলে মনে করেন রানা প্লাজা মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।
এ উদ্ধার নাটকের মূল চরিত্রে কীভাবে এলেন- এমন প্রশ্নের জবাবে রেশমা বলেন, ‘এ নিয়ে এখন আর কথা বলতে চাই না।’
রেশমা উদ্ধারের ঘটনা
ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৭ দিন পর পোশাককর্মী রেশমা উদ্ধারের ঘটনাটি ছিল সাজানো নাটক। আওয়ামী লীগ সরকার বিদায়ের পর এ নিয়ে মুখ খোলেন আহত শ্রমিকরা। রেশমা উদ্ধারকে নাটক হিসেবে দেখছেন খোদ রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ভবনে চাপা পড়া এবং পরবর্তী সময়ে উদ্ধার হওয়া শ্রমিকরা।
ভবন রানা প্লাজা ধসে পড়ার ১৭ দিন পর ১০ মে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয় রেশমাকে। এ ঘটনা সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। রেশমাকে উদ্ধারের ঘটনা সরকারের সাজানো নাটক ছিল বলে যুক্তরাজ্যের সংবাদপত্র ‘দ্য মিরর’ এর প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, রানা প্লাজার তৃতীয় তলায় রেশমার সঙ্গে কাজ করতেন এমন একজন পুরুষ কর্মী জানিয়েছেন, ভবন ধসে পড়ার পর ওই দিনই তিনি এবং রেশমা একসঙ্গে ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসেন।
১৭ দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে রেশমাকে বের করার সময় তাকে বেশ প্রাণবন্ত দেখা গেছে। ওই সময় তার পরনের নতুন ও পরিষ্কার পোশাক এবং হাতের সব আঙুলের নখ কাটা ছিল। এ নিয়েও ওই সময় বেশ প্রশ্ন ওঠে। ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হয়েই মোবাইলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কথা বলার আগ্রহ দেখানো নিয়েও প্রশ্ন করেন কেউ কেউ।
কথা বলতে চান না রেশমা
আইন মন্ত্রণালয়ের নথিতে ১৭ দিন পর উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয়ে জানতে রেশমার ব্যক্তিগত মোবাইলে ফোন করলে তিনি এ বিষয়ে পরে কথা বলবেন না বলে জানান। ওই সময়ের ঘটনায় তিনি এখন অনুতপ্ত কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি এখন আর কথা বলতে চাই না।’
তবে এর আগে তিনি একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নতুন পোশাকের বিষয়ে বলেন, ‘আমি যখন ভেতরে ছিলাম, আমার পরনের সব কাপড় ছিঁড়ে ফেটে গিয়েছিল। আমি বের হওয়ার আগে হাতের কাছে যা পেয়েছি, তাই পরেছি। ওখানে অনেকগুলো কাপড় ছিল। সেখান থেকেই নিয়েছিলাম।’ মাথার চুল কাটা ছিল কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘ওখানে কাঁচি ছিল, কাঁচি দিয়ে চুল কেটেছিলাম।’
যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন রেশমা, রানা প্লাজা ধসের পর চিকিৎসা নিয়ে দুদিনের মাথায় ওই বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। এর কয়েকদিন পর গ্রামে নিজ বাড়িতে গিয়ে থাকেন। এরপর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর কবীর নানকের ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয় রেশমা উদ্ধার নাটক। বাড়ির মালিকের এমন স্বীকারোক্তির বিষয়ে রেশমার কাছে জানতে চাইলে তিনি ওই গণমাধ্যমটিকে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমিও এটা শুনেছি। সে (বাড়িওয়ালা) নাকি বলেছে, আমাকে দুদিন পরে উদ্ধার করা হয়েছে, পরে আবার সেখানে ঢোকানো হয়েছে…’।