
X
দেশে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই: ডিএমপি
১. বাজেটের আকার এবং সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা (গত ৩ বছর)
২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কিছুটা "সংকোচন" বা আকার কমিয়ে আনার একটি বিরল প্রবণতা দেখা গেছে।
২. আয় পরিকল্পনা এবং রাজস্ব আদায়
বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে নিম্ন রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত (প্রায় ৮-৯%) নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। রাজস্বের সিংহভাগ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) মাধ্যমে সংগৃহীত হয়, যার প্রধান উৎস ভ্যাট (VAT) এবং আয়কর।
২০২৩-২৪ অর্থবছর: লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫,০০,০০০ কোটি টাকা; যা সংশোধিত বাজেটে ৪,৭৮,০০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। প্রকৃত আদায় ছিল প্রায় ৩,৮২,৬৭৮ কোটি টাকা (এনবিআরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার ৯৩%)।
২০২৪-২৫ অর্থবছর: মূল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫,৪১,০০০ কোটি টাকা। অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে ঘাটতি মেটাতে ২০২৫ সালের শেষের দিকে লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৫,৮৮,০০০ কোটি টাকা করা হয়, যদিও প্রকৃত আদায় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছর: লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫,৬৪,০০০ কোটি টাকা। বাড়তি মূল্যস্ফীতির চাপ এড়াতে সরকার করের হার না বাড়িয়ে বরং করের আওতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
৩. ব্যয় বিশ্লেষণ
বাজেটকে প্রধানত পরিচালন ব্যয় (বেতন, ঋণের সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি) এবং উন্নয়ন ব্যয় (অবকাঠামো, এডিপি) এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
পরিচালন (রাজস্ব) ব্যয়:
অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের চাপে এই ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে, যা এখন বাজেটের একটি বড় অংশ গ্রাস করছে।
সুদ পরিশোধ: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সুদ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,১৩,৫০০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৪%।
উন্নয়ন ব্যয় (ADP):
বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের "মিতব্যয়িতা" নীতির কারণে উন্নয়ন ব্যয়ে কাটছাঁট করা হয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছর: সংশোধিত এডিপি ছিল ২,৪৫,০০০ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছর: মূলত ২,৬৫,০০০ কোটি টাকা ধরা হলেও ব্যয় সুশৃঙ্খল করতে তা কমিয়ে ২,০০,০০০ কোটি টাকা করা হয়েছে (২৪% হ্রাস)।
২০২৫-২৬ অর্থবছর: লক্ষ্যমাত্রা ২,৩০,০০০ কোটি টাকা; নতুন প্রকল্প শুরু করার চেয়ে চলমান প্রকল্পগুলো শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৪. খাতভিত্তিক ব্যয় (২০২৫-২৬ অর্থবছর)
জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট মোকাবিলায় বর্তমান বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা এবং কৃষিখাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
৫. অর্জন এবং চ্যালেঞ্জসমূহ
ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩.৬% প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে একটি "অর্জন" হলেও প্রবৃদ্ধি উদ্দীপিত করার ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতাকে সীমিত করে।
মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনা: সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫% হলেও গত দুই বছর ধরে প্রকৃত মূল্যস্ফীতি ৯-১০% এর আশেপাশে অবস্থান করছে। এক্ষেত্রে বড় অর্জন হলো মূল্যস্ফীতিকে "নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা", কমানো নয়।
এডিপি বাস্তবায়ন: উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি একটি নিয়মিত চ্যালেঞ্জ। সাধারণত অর্থবছর শেষে এডিপি বাজেটের মাত্র ৭৫-৮০% ব্যয় করা সম্ভব হয়।
গত ৩ বছরের বাংলাদেশের জিডিপি (GDP) এবং মূল্যস্ফীতির বিশ্লেষণ
১. জিডিপি প্রবৃদ্ধি বিশ্লেষণ:"ধীরগতির পর্যায়
এক দশক ধরে বাংলাদেশ ৬% থেকে ৭% প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রেখেছিল। তবে গত তিন বছরে উৎপাদন বিলম্ব, কঠোর মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দার কারণে প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের ধীরগতি দেখা গেছে।
পর্যবেক্ষণ:
শিল্প খাতে মন্দা: ২০২৫ সালের শেষের দিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে ৬.২৩% এ নেমেছে, যা ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে অনীহার প্রতিফলন।
বিনিয়োগ হ্রাস: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২.৪৮% এ নেমে এসেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
২. মূল্যস্ফীতি বিশ্লেষণ:"স্থবির" চ্যালেঞ্জ
মূল্যস্ফীতি বর্তমানে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ। খাদ্যপণ্যের দাম এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে এটি গত দুই বছর ধরে ৯%-১০% এর ঘরে আটকে আছে।
মূল্যস্ফীতির উপাদান (২০২৬-এর শুরু পর্যন্ত):
খাদ্য বনাম খাদ্যবহির্ভূত: খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও জ্বালানি সমন্বয় করায় পরিবহন ও স্বাস্থ্যসহ বিবিধ পণ্যের দাম ২৪% পর্যন্ত বেড়েছে।
মজুরি প্রবৃদ্ধির ব্যবধান: ২০২৫-এর শেষে মজুরি সূচক ছিল ৮.০৪%, অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধি ৯% মূল্যস্ফীতির সাথে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে।
৩. সামষ্টিক অর্থনৈতিক সারসংক্ষেপ (সিজার্স ইফেক্ট/কাঁচি প্রভাব)
অর্থনীতি বর্তমানে একটি "কাঁচি প্রভাবের" মধ্যে পড়েছে—যেখানে প্রবৃদ্ধি নিচের দিকে নামছে (নিম্নগামী) আর মূল্যস্ফীতি ওপরের দিকে (ঊর্ধ্বগামী) অবস্থান করছে।
আর্থিক প্রতিক্রিয়া: মূল্যস্ফীতি রুখতে বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসি রেট (রেপো) ১০% এ উন্নীত করেছে। এই "সংকুচিত মুদ্রানীতি" মূল্যস্ফীতি কমাতে প্রয়োজনীয় হলেও এর ফলে ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধীর হচ্ছে।
রাজস্ব সীমাবদ্ধতা: ট্যাক্স-টু-জিডিপি অনুপাত ৬.৮%-৭.৭% এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় সরকার বড় ঋণ ছাড়া উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারছে না।
৪. ২০২৬-২৭ এর সম্ভাবনা
২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণ করতে যাচ্ছে। এটি একটি দ্বি-ধারী তলোয়ারের মতো:
অর্জন: দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির স্বীকৃতি।
চ্যালেঞ্জ: প্রধান বাজারগুলোতে (ইইউ, যুক্তরাজ্য ইত্যাদি) শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানো, যা রপ্তানি সক্ষমতা না বাড়ালে জিডিপির ওপর চাপ তৈরি করবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ এবং অর্থনীতি উন্নয়নে সম্ভাব্য সমাধান
১. প্রধান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ (২০২৬)
অব্যাহত মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস: ২০২৪-এর ১১.৩৮% থেকে কিছুটা কমলেও এটি এখনো ৮-৯% এ আটকে আছে, যা সাধারণ মানুষের সঞ্চয় কমিয়ে দিচ্ছে।
ব্যাংকিং খাত ও খেলাপি ঋণ সংকট: খেলাপি ঋণ (NPL) ২০২৫-এর শেষের দিকে মোট ঋণের প্রায় ৩৬% এ দাঁড়িয়েছে। এছাড়া সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়া কঠিন করে তুলেছে।
এলডিসি উত্তরণ: শুল্কমুক্ত সুবিধা চলে গেলে পোশাক খাতের রপ্তানি ৮-১১% কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
রাজস্ব ঘাটতি: জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার মাত্র ৭%, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন।
২. উন্নয়ন ও অগ্রগতির রোডম্যাপ স্বল্পমেয়াদি (ভিত্তি স্থিতিশীল করা):
আর্থিক শৃঙ্খলা: মূল্যস্ফীতি ৭% এর নিচে না আসা পর্যন্ত পলিসি রেট ১০% এ রাখা।
ব্যাংক সুশাসন: "ব্যাংকিং কমিশন" গঠন করে দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ এবং "ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের" কঠোর কালো তালিকাভুক্ত করা।
বাজার মনিটরিং: খাদ্য সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে বিশ্ববাজারের দাম কমার সুফল স্থানীয় বাজারে নিশ্চিত করা।
মধ্যমেয়াদি (কাঠামোগত সংস্কার):
রাজস্ব অটোমেশন: এনবিআরের পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন এবং ই-রিটার্ন ও ই-পেমেন্ট বাধ্যতামূলক করা।
রপ্তানি বহুমুখীকরণ: পোশাক খাতের ওপর ৮০% নির্ভরতা কমিয়ে আইটি, ওষুধ ও চামড়া শিল্পে কর সুবিধা দেওয়া।
LDC প্রস্তুতি: ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে GSP+ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে (ভারত, ভিয়েতনাম) CEPA চুক্তি স্বাক্ষর করা।
জিডিপির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বাজেটের বিশ্লেষণ
১. বাজেট-জিডিপি চিত্র (গত ৩ বছর)
টাকার অঙ্কে বাজেটের আকার প্রতি বছর বাড়লেও, মোট অর্থনীতির তুলনায় এর আপেক্ষিক আকার আসলে কমছে।
বিশ্লেষণ: ১২.৭% বাজেট-জিডিপি অনুপাত একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য অত্যন্ত কম (বিশ্বের গড় প্রায় ২০% এর উপরে)। এটি নিম্ন কর আদায়ের কারণে সরকারের সীমিত "ফিসকাল স্পেস" বা খরচ করার সক্ষমতার প্রতিফলন।
২. রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত: প্রধান বাধা
বাংলাদেশের রাজস্ব আয় জিডিপির মাত্র ৮.৫% থেকে ৯.৩% এর মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এনবিআরের কর আদায়ের হার ৭.৭%, যা ভারত বা ভিয়েতনামের চেয়েও অনেক কম।
৩. ঘাটতি ও ঋণ বিশ্লেষণ
বাজেট ঘাটতি: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঘাটতি জিডিপির ৩.৬% ধরা হয়েছে (যা ২০২২-২৩ এ ৪.৬% ছিল)। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এই ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
ঋণ-জিডিপি অনুপাত: মোট সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ৩৭.৫%। এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঝুঁকিপূর্ণ না হলেও, ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে বাজেটের ১৫-১৬% অর্থ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।
৪. উন্নয়ন বনাম পরিচালন ব্যয়
পরিচালন ব্যয় (চলতি খরচ): বেতন, সুদ ও ভর্তুকির কারণে এটি জিডিপির প্রায় ৯% এ বজায় আছে।
এডিপি (উন্নয়ন ব্যয়): এডিপি বা উন্নয়ন ব্যয় জিডিপির ৬.৭% (২০২৩-২৪) থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫.৯% এ নেমে আসার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়ার বাজেটের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
১. সামষ্টিক পর্যায়ের তুলনা (বাজেট বনাম জিডিপি)
মালয়েশিয়া তার অর্থনীতির আকারের তুলনায় বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বড় একটি আর্থিক ইঞ্জিন পরিচালনা করে।
প্রধান পার্থক্যসমূহ:
আর্থিক গভীরতা (Fiscal Depth): মালয়েশিয়া সরকার তার জিডিপির তুলনায় বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ শতাংশ সংগ্রহ এবং ব্যয় করে। এটি মালয়েশিয়াকে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং পরিবহনের মতো জনসেবাগুলোতে অনেক বেশি বিনিয়োগের সুযোগ করে দেয়।
ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ: মালয়েশিয়া অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তার ঘাটতি কমিয়ে আনছে (২০২৬ সালের মধ্যে ৩.৫% এ আনার লক্ষ্য), যেখানে বাংলাদেশ তার অত্যন্ত সংকীর্ণ কর কাঠামোর কারণে ঘাটতি ৫% এর নিচে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
২. রাজস্ব মডেল: আয়ের উৎস
বাংলাদেশ: পরোক্ষ কর (ভ্যাট এবং আমদানি শুল্ক)-এর ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল। সরাসরি আয়কর আদায়ের হার বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন।
মালয়েশিয়া: কোম্পানি কর (কর্পোরেট), ব্যক্তিগত আয়কর এবং পেট্রোলিয়াম-সংক্রান্ত রাজস্বের (পেট্রোনাস থেকে প্রাপ্ত) একটি পরিপক্ব সংমিশ্রণ। এছাড়া তারা উচ্চ আমদানি শুল্কের বদলে "সেলস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্স" (SST) সম্প্রসারণ করছে, যা তাদের অর্থনীতিকে বাণিজ্যের জন্য আরও উন্মুক্ত করে তুলেছে।
৩. খাতভিত্তিক ব্যয়ের অগ্রাধিকার
ব্যয়ের ধরনগুলো একটি নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ (বাংলাদেশ) বনাম একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের (মালয়েশিয়া) ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকারগুলো ফুটিয়ে তোলে।
ক. উন্নয়ন ব্যয় (ADP বনাম DE):
বাংলাদেশ (ADP): মূলত "হার্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার" বা ভৌত অবকাঠামো—সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং রেল সংযোগের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপি ছিল মোট বাজেটের প্রায় ৩৩%।
মালয়েশিয়া (Development Expenditure):"ডিজিটাল এবং সামাজিক অবকাঠামো-র ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। ২০২৫ সালের বাজেটে তারা এআই (AI) সেন্টার, গ্রিন এনার্জি ট্রানজিশন এবং হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং হাবের জন্য রেকর্ড অর্থ বরাদ্দ করেছে।
খ. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য:
বাংলাদেশ: এই দুই খাতের সম্মিলিত ব্যয় সাধারণত জিডিপির ৩% এর নিচে থাকে। শিক্ষা বাজেটের বড় অংশই যায় প্রাথমিক শিক্ষা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে।
মালয়েশিয়া: ধারাবাহিকভাবে তাদের মোট বাজেটের প্রায় ২০% শিক্ষায় বরাদ্দ করে। উচ্চ-আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্যে তারা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (TVET) এবং বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেয়।
৪. ভর্তুকি এবং ঋণ সেবা
উভয় দেশই উচ্চ সুদ এবং ভর্তুকি বিল নিয়ে লড়াই করছে, তবে কারণগুলো ভিন্ন।
ঋণ সেবা (Debt Service): উচ্চ সুদের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের কারণে সুদ পরিশোধ করতেই বাংলাদেশের বাজেটের প্রায় ১৫% ব্যয় হয়ে যায়। মালয়েশিয়ার ঋণের পরিমাণ অংকে বেশি হলেও, স্বল্প সুদের ক্যাপিটাল মার্কেটে তাদের প্রবেশাধিকার ভালো।
ভর্তুকি: মালয়েশিয়া বর্তমানে সাধারণ ভর্তুকি (যেমন—পেট্রোল/ডিজেল) কমিয়ে ‹PADU› ডেটাবেসের মাধ্যমে "টার্গেটেড সাবসিডি" বা লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি ব্যবস্থা চালু করছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ এখনো বিদ্যুৎ ও সারে ব্যাপক ভর্তুকি দিচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেই বাজেটের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে।
৫. জিডিপি, মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব ঘাটতির প্রাক্কলন (Projections)
উন্নত রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর ভিত্তি করে মধ্যমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে একটি মাঝারি ধরনের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি: এটি একটি প্রধান নীতিগত উদ্বেগ হিসেবে রয়ে গেছে, যা নিরসনে রাজস্ব নীতি এবং মুদ্রানীতির মধ্যে নিবিড় সমন্বয় প্রয়োজন।
আর্থিক শৃঙ্খলা: সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা (Fiscal Discipline) বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সামনের পথ: ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কর জাল সম্প্রসারণই হবে প্রধান চাবিকাঠি।
জিডিপি, মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব ঘাটতির প্রাক্কলন
উন্নত রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর ভিত্তি করে মধ্যমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে একটি মাঝারি ধরনের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজস্ব নীতি এবং মুদ্রানীতিসহ বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নয়নে প্রস্তাবনা
১. রাজস্ব নীতি: "মিতব্যয়িতা"থেকে"দক্ষতা"
বর্তমান রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা হলো বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩.৬% এর মধ্যে রাখা। তবে মূল চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ রাজস্বের অভাব।
ক. রাজস্ব আহরণ (কর সংস্কার):
“শূন্য-অব্যাহতি” কৌশল: কর অব্যাহতির কারণে বাংলাদেশ তার জিডিপির প্রায় ২-৩% হারায়। বাজেটে সমস্ত শিল্প কর অবকাশের (Tax Holiday) ওপর ৫ বছরের একটি ‹সানসেট ক্লজ› বা সময়সীমা রাখা উচিত এবং একটি অভিন্ন কর্পোরেট কর হারের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত।
এনবিআর-এর অটোমেশন: সম্পূর্ণ কাগজবিহীন কর ব্যবস্থা চালু করা। এনবিআর-এর তথ্যকে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং ব্যাংক রেকর্ডের সাথে একীভূত করার মাধ্যমে যারা কর জালের বাইরে থেকেও উচ্চ ব্যয় করছেন, তাদের শনাক্ত করা সম্ভব।
সবুজ কর (Green Taxation): পরিবেশ দূষণকারী শিল্প (যেমন- ইটভাটা এবং পুরনো যানবাহন) এর ওপর "কার্বন ট্যাক্স" আরোপ করা। এতে রাজস্ব বাড়বে এবং জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে।
খ. ব্যয়ের যৌক্তিকীকরণ:
ভর্তুকি সংস্কার: জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ঢালাও ভর্তুকি থেকে সরে আসা। সবার জন্য বিদ্যুতে ভর্তুকি না দিয়ে, শুধুমাত্র নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সরাসরি নগদ সহায়তা (DBT) প্রদান করা উচিত।
এডিপির জন্য জিরো-বেজড বাজেটিং: প্রতি বছর প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে যাচাই করা। তিন বছরে যে প্রকল্পের অগ্রগতি ২০% এর কম, সেগুলো বাতিল করে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ করা।
২. মুদ্রানীতি: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে ১০% পলিসি রেটসহ একটি সংকোচনমূলক অবস্থানে রয়েছে। পরবর্তী ধাপে এই হারের "প্রভাব" (Transmission) নিশ্চিত করতে হবে যাতে প্রকৃত অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত না করে মূল্যস্ফীতি কমানো যায়।
ক. সুদের হার ও তারল্য ব্যবস্থাপনা:
ধনাত্মক প্রকৃত সুদের হার: সঞ্চয়কে উৎসাহিত করতে এবং ফটকা খরচ কমাতে পলিসি রেটকে মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে অন্তত ২% উপরে রাখার লক্ষ্য রাখতে হবে।
অ্যাড-হক তারল্য সহায়তা বন্ধ করা: দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের "টাকা ছাপানো" (Devolved Injections) বন্ধ করতে হবে। পরিবর্তে, একটি ‹ব্যাংক রেজোলিউশন ফ্রেমওয়ার্ক› ব্যবহার করে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত বা অবসায়ন করতে হবে।
খ. বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা:
বাজারভিত্তিক "ক্রলিং পেগ": নিয়ন্ত্রিত হার থেকে সম্পূর্ণ বাজারচালিত বিনিময় হারের দিকে যাওয়া। এটি আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক (কার্ব মার্কেট) হারের পার্থক্য কমিয়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াবে।
রিজার্ভ পুনর্গঠন: সরাসরি নগদ ভর্তুকির পরিবর্তে এক্সচেঞ্জ রেট নিউট্রালিটির মাধ্যমে রপ্তানি উৎসাহিত করে ৪-৫ মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান রিজার্ভ গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা।
৩. কাঠামোগত সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংস্কার
ক. ব্যাংকিং খাতের "পরিচ্ছন্নতা":
খেলাপি ঋণ (NPL) টাস্কফোর্স: একটি ডেডিকেটেড "অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি" (AMC) গঠন করা উচিত যা ব্যাংক থেকে মন্দ ঋণ কিনে নেবে এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত সম্পদ উদ্ধার করবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন: সুদের হারের সিদ্ধান্ত এবং ব্যাংক লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে আইনগত সুরক্ষা দেওয়া।
খ. তথ্যের সততা ও স্বচ্ছতা:
বিবিএস (BBS) আধুনিকায়ন: বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনার জন্য জিডিপি এবং মূল্যস্ফীতির তথ্য রিয়েল-টাইমে প্রকাশ করা (বিলম্বিত বা কৃত্রিমভাবে মসৃণ করা তথ্যের পরিবর্তে) অপরিহার্য।
বাংলাদেশের পরবর্তী বাজেটের উন্নয়নে প্রস্তাবনা: খাতভিত্তিক প্রস্তাবনা
১. সামগ্রিক রাজস্ব ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা: "ব্যবধান ঘুচানো"
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের (~৭.৩%) দেশ। আগামী বাজেটে করের হার বাড়ানোর চেয়ে করের জাল বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
রাজস্ব কাঠামো (২০২৬-২৭ লক্ষ্যমাত্রা):
খাতভিত্তিক বিনিয়োগের অগ্রাধিকার: অবকাঠামো (২০-২২%), সামাজিক সুরক্ষা (১৫%), শিক্ষা (১২-১৩%), স্বাস্থ্য (৯-১০%), কৃষি (১০%)।
২. শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন: এআই এবং প্রযুক্তিগত উল্লম্ফন"
২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণের সাথে সাথে ফোকাস হতে হবে গুণমান এবং প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির ওপর।
এআই (AI) ইন্টিগ্রেশন: চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য যুবকদের প্রস্তুত করতে এআই অ্যাপ্রেন্টিসশিপ" এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ বরাদ্দ।
কারিগরি শিক্ষা (TVET): ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের দক্ষতার ঘাটতি মেটাতে কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজেট অন্তত ১৫% বাড়ানো।