
X
ফাইল ছবি
মানিকগঞ্জ জেলার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দুইটি হাসপাতাল ও একটি মেডিকেল কলেজ এখনো সুকৌশলে দখল রেখেছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদধারী নেতারা স্বপদে বহাল রয়েছে। এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানে এখনও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আত্মীয় স্বজনরা বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়,সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের আত্মীরা এসব নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন। সেই সময় গাজীপুর জেলার আওয়ামী লীগের নেতা আমজাদ হোসেন পলাশ ছিলেন সাবেক যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেলের পারিবারিক সদস্য। সেই সূত্র ধরেই সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ঘনিষ্ঠ হওয়ার পরই মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০২১ সালে আউটসোর্সিংয়ে ১২০ জন জনবল নিয়োগের টেন্ডার পায় মেসার্স মিয়া এন্টারপ্রাইজ। ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক পলাশ। সেই পলাশকে টেন্ডার দিয়ে নিজের আত্মীয়-স্বজন ও দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়োগ করেছেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী। নিজের লোকজনকে ওই হাসপাতালে বহাল রাখতে টেন্ডারের সময় শেষ হওয়ার পরেও ২০২১-২০২২ ও ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে পরপর দুইবার সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর আবার নতুন টেন্ডার হয় ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরে। সেই বছরও সাবেক পরিচালক আশ্বাদ উল্লাহর মাধ্যমে আরও ৪০ জন বাড়িয়ে ১৬০ জনবলের টেন্ডার সুকৌশলে পলাশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেই দেওয়া হয়। বর্তমান পরিচালক ডা. শফিকুল আলমের সহায়তায় নতুন করে সময় বাড়িয়ে এখনও সেই অদক্ষ জনবল দিয়েই চালানো হচ্ছে কার্যক্রম।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মানিকগঞ্জ মেডিকেল হাসপাতালে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাজের লোক চান্দু মিয়ার মেয়ে রিমা আক্তারকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল আয়া পদে, তবে তিনি এখন আল্ট্রাসনোগ্রাম ল্যাবের অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। এছাড়া চান্দু মিয়ার ভাতিজা মনির হোসেন নিয়োগ পান জমাদার সরদার হিসেবে, মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মো. সিজান নিয়োগ পান সহকারী বাবুর্চী পদে, স্বপনের ফুপাতো ভাইয়ের লোক তারিকুল ইসলাম নিয়োগ পান লিফটম্যান অপারেটর পদে, স্বপনের ফুপাতো ভাই সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ইসরাফিলের আত্মীয় ইয়াসমিন আক্তার নিয়োগ পান আয়া পদে, স্বপনের প্রতিবেশী শামীম খান নিয়োগ পান ওয়ার্ড মাস্টার পদে, মন্ত্রীর প্রতিবেশী মীর আব্দুস সালাম কিচেন সুপারভাইজার, ছাত্রলীগ নেতা মো. সুজন মিয়া ওয়ার্ড মাস্টার, কৃষ্ণপুর ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের সভাপতি মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, সদর উপজেলা শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক টাইগার লিটনের আপন ছোট ভাই মো. মামুন খান সহকারী বাবুর্চি, মানিকগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমের কর্মী রুপালী আক্তার রেন্ট কালেক্টর, ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী শাহিনুর ইসলাম ওয়ার্ড বয়, হরগজ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদকের ছেলে মো. রাজিব মিয়া পরিচ্ছন্নতাকর্মী, সাবেক মন্ত্রীর নিজ ইউনিয়ন গড়পাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আফসার সরকারের লোক পারভীন আক্তার আয়া, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদের নাতি তুজান্নাহার তুলি ইটিটি টেকনিশিয়ান, সাবেক পরিচালক আশ্বাদ উল্লাহর ভায়রার ছেলে সানজিদুল ইসলাম সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণ টেকনিক্যাল পার্সন হিসেবে নিয়োগ পেয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।
এদিকে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ শাখায় আছেন গড়পাড়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতির ভাতিজা সুজন চন্দ্র সাহা মেডিকেল কলেজে ল্যাব এটেনডেন্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মেডিকেল কলেজ শাখায় আয়া পদে দায়িত্বে রয়েছে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আসমা আক্তার,মানিকগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক প্লাবন হোসেন হৃদয় ল্যাব এটেনডেন্ড হিসেবে কর্মরত রয়েছে। সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আফসার সরকারের পিএস কামাল হোসেন পাম্প মেকানিক পদে রয়েছে।মানিকগঞ্জ পৌর ছাত্রলীগের ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক পৌর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জাহিদের ভাতিজি মনিরা আক্তার আয়া হিসেবে কাজ করছে। আফসার সরকারের আপন ভাতিজা মিঠু সরকার ম্যাসেঞ্জার পদে রয়েছে, দিঘুলিয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকাশ আহমেদ জমাদার পদে ও নবগ্রাম ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আতিকু রহমান রয়েছে লাইব্রেরি এটেনডেন্ড পদে চাকরি করছে। এদের মধ্যে দিঘী ইউনিয়ন যুবলীগের সেক্রেটারি সমচান শেখ হোস্টেল এটেনডেন্ড হিসেবে কর্মরত রয়েছে ।
এছাড়াও মানিকগঞ্জ ২৫০ শস্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে আউট সোর্সিং টেন্ডারের দায়িত্ব নেন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ- সভাপতি শওকত আহমেদ । এই হাসপাতালের দায়িত্বরত বর্তমান তত্বাবধায়ক তিনিও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন। তিনি ততকালীন সময় দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে দ্বায়িত্ব পালনকালে সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রীর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন।এর পর সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী মানিকগঞ্জ ২৫০শষ্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়ক করে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে নিজের একাধিক ছবি সাটিয়ে হাসপাতাল ও জেলা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিতে বিশাল প্রভাব বিস্তার করেন। রহস্যজনক কারনে তিনি এখনও বহাল তবিয়তেই রয়েছে।
এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দায়িত্বে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সমাজের সচেতন মহল।
মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি ও পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এ্যাড বজলুর রহমান বলেন, জেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে হাসপাতাল। সেই হাসপাতালে আওয়ামী লীগের পদধারী নেতাকর্মীরা বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছে। বিষয়টি হতাশার এবং খুবই দুঃখ জনক। এদের হাতে স্বাস্থ্য খাত নিরাপদ নয়। এদের নিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠান এবং নিয়োগপ্রাপ্ত জনবলের দ্রুত অপসারণ না করলে হাসপাতালে নিরাপদ থাকবে না।
মানিকগঞ্জ ২৫০ শস্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডাঃ বাহাউদ্দীন বলেন, গত দুইমাস আগে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ হয়েছে। কিন্তু আউট সোর্সিংয়ের নিয়োগপ্রাপ্ত জনবল পূর্বের লোকই স্বপদে বহাল রয়েছে।
মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, সর্বশেষ মিয়া এন্টারপ্রাইজ আউট সোর্সিংয়ের জনবল নিয়োগের টেন্ডার পেয়েছেন। তিনি কোন দলের সমর্থক আমি জানি না। তিনি ছাড়া আর কেউ ওই টেন্ডারের আবেদন করেনি। তিনি একাই আবেদন করে টেন্ডার পেয়েছেন।
২৫০ শষ্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল মানিকগঞ্জের তত্ত্বাবধায়ক ডা বাহাউদ্দিন বলেন, আগের যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছিলো সেই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা করতেন শওকত আহমেদ। এখনো তার নিয়োগ দেওয়া লোকগুলোই বহাল রয়েছে। এবছর নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কাজ পেয়েছে তাদের বলেছি কোন লোকের বিষয়ে অভিযোগ থাকলে পরিবর্তন করতে।
মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডাঃ মোস্তফা জাহিদ কামাল বলেন, আমি নতুন আসছি, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আমি অবগত নই।