জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল দেশের একমাত্র বিশেষায়িত হৃদরোগ হাসপাতাল। বছরে ৫ লক্ষাধিক রোগী সারাদেশ থেকে ছুটে আসেন হাসপাতালটিতে। দেশে হৃদরোগ পরিস্থিতি এবং চিকিৎসা ও গবেষণার হাল-হাকিকত নিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলছেন বাংলাদেশ বুলেটিনের বিশেষ প্রতিনিধি কাজী দ্বীন মোহাম্মদ।
বাংলাদেশের হৃদরোগের বর্তমান পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী: বাংলাদেশে অসংক্রামক রেগে আক্রান্তের হার ৭০ শতাংশ। তার মধ্যে মৃত্যুর কারণ হিসেব করলে এককভাবে সর্বোচ্চ হলো স্ট্রোক এবং হৃদরোগ।
আমাদের প্রত্যাশিত গড় আয়ু এখন ৭৪ বছর। এটি দিনে দিনে বাড়ছে। এ বয়স যত বাড়বে, তত হৃদরোগজনিত রোগগুলো বাড়ার সম্ভাবনা বাড়বে। এ ছাড়া আগে হার্ট এটাকে চট করে রোগী মারা যেত। এখন তাদের চিকিৎসা হচ্ছে, সে বেঁচে থাকছে। অর্থাৎ সাকসেসফুলি হৃদরোগের কারণে মৃত্যুর হারটা আমরা অনেক পিছিয়ে দিতে পারছি। এটা আমাদেরকে মনে রাখতে হবে।
হৃদরোগের পেছনে কী কী কারণ রয়েছে?
অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী: ‘ইন্টারহার্ট স্টাডি’ নামে একটা বিরাট স্টাডিতে দেখা গেল যে ইউরোপে বা আমেরিকায় প্রথম হার্ট এটাকের বয়স ৬১ থেকে ৬৫। আর আমার দেশে সেটা ৫১-৫২, জাপানে ৭০-এর ওপর। জাপানের সাথে তুলনা করলে আমরা ২০ বছর আগে হার্টের রোগী হচ্ছি, ইউরোপের ১০ বছর আগে। এর পেছনে আমাদের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য দায়ী।
দ্বিতীয়ত, আমাদের লাইফস্টাইল চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। কায়িক পরিশ্রম নেই। তৃতীয়ত, খাদ্যাভ্যাস। আমাদের খাদ্যাভ্যাসে তেল, চর্বি, চিনি এবং লবণ বেড়ে যাচ্ছে। দোকানের খাবার তৈরীর প্রসেসের কারণে নরমাল ফ্যাটটা ট্রান্সফ্যাট হয়ে যাচ্ছে। আর তা হজম করার ক্ষমতা আমাদের শরীরের নেই। আমাদের শরীরে এই চর্বি জমে হার্ট এটাক, স্ট্রোক, গ্যাংরিন, ব্লাড সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যাওয়া- এ ধরনের রোগ বেশি হচ্ছে।
চতুর্থত, আমাদের ঘুম। শারীরবৃত্তীয় কারণে, আমাদের শরীরে নানা অঙ্গে এনজাইমের স্টোরে সারাদিনে যে ক্ষয় হলো, সেটার ‘রিপারেশন টাইম’ বা ক্ষয় পূরণের সময় হলো এই ঘুম। আমরা কি ঠিকমত কিংবা সময়মত ঘুমাচ্ছি? এভাবে আমাদের অভ্যাসগুলো চেঞ্জ হয়ে যাওয়ায় শারীরবৃত্তীয় নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আমাদের হরমোনাল ইমব্যালেন্স তৈরি করছে। এ ছাড়া মোবাইল সংস্কৃতি, পরিবেশ দূষণ, ধূমপান- এসব নিয়ে কিন্তু আমরা ভাবছি না। কিন্তু হিসাবের মধ্যে এগুলো আছে। এসবের কারণে আমাদের হৃদরোগের আশঙ্কা অনেক বেশি বেড়ে যাচ্ছে।
অন্যান্য নন-কমিউনিকেবল ডিজিজের সাথে হৃদরোগের সম্পর্কটা কী রকম?
অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী: আপনি যখনই হার্টের রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো দেখবেন, সবার উপরে উচ্চ রক্তচাপ। এরপর ডায়াবেটিস, প্রি ডায়াবেটিস এবং স্থূলতা। আরেকটা হচ্ছে স্মোকিং। যারা হার্টের রোগী, তাদের দেখবেন ৪০ ভাগের মধ্যে স্মোকিং অথবা চুইং টোব্যাকো ব্যবহারের হিস্ট্রি আছে। এসব কারণে বিভিন্নভাবে হার্টের ব্লাড সাপ্লাইয়ে চর্বি জমে সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে যেটি ঘটে, সেটিই হার্ট এটাক।
আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং কার্ডিয়াক সার্জারির ক্ষেত্রে ইনস্টিটিউটের সক্ষমতা কী রকম বলবেন কি?
অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী: বাৎসরিক হিসাবটা দেই। গত বছরে আউটডোরে রোগী এসেছে সোয়া দুই লাখের মত, ইমারজেন্সিতে ১ লাখ ৯০ হাজার এবং ইনডোরে ভর্তি ছিল ১ লাখ ১৫ হাজারের মত। অর্থাৎ বছরে লক্ষ লক্ষ মানুষের চিকিৎসা হচ্ছে এখানে। সমস্যা হচ্ছে আমার সামর্থ্য কতটুকু? আমি প্রত্যেককে এক টাকা করে ১০ জনকে ১০ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু আমার মানুষ হয়ে গেছে ২০ জন। তার মানে সবার কপালে ৫০ পয়সার ট্রিটমেন্ট দিতে পারছি। আমাকে রেশনিং করতে হচ্ছে, কাউকে কাউকে পুরোটা দিতে পারছি, কাউকে কোন মতে ঠেকা দিয়ে কাজ চালানোর মত ট্রিটমেন্ট দিতে পারছি।
এই সক্ষমতা কি শুধু আমার এখানে বাড়ালেই হবে? এইরকম ক্যাপেবল সেন্টার দেশের সর্বত্র তৈরি করা উচিত। ইনস্টিটিউট অব কার্ডিভাস্কুলার ডিজিজ প্রত্যেকটা বিভাগীয় শহরে হওয়া উচিত। একই সঙ্গে সব কয়টি মেডিকেল কলেজের কার্ডিওলজি বিভাগের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার।
ইনফ্রাস্টাকচারের কথা তো বললাম, আমাদের কিন্তু যোগ্য স্পেশালিস্টেরও অভাব আছে। দেশে প্রায় ১৮ কোটি মানুষ, এর বিপরীতে যে পরিমাণ কার্ডিওলজিস্ট থাকা দরকার তা নেই। পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জন মনে হয় না সারাদেশে ১০ জন আছে। এত খারাপ অবস্থা। আমাদের একজন মন্ত্রী মহোদয় তার রোগী পাঠিয়েছন। তার জন্য আমাকে সার্জনের কাছে তদবির করতে হচ্ছে যে ওকে দেখতে কত তাড়াতাড়ি তারিখটা sদেওয়া যায়। সে বলছে, স্যার, আমি কী করে পারব? এখন ওকে তো আমি দোষ দিতে পারি না। ওর যে ব্যাকলগ আছে, তার মধ্যে আরেকটা পেশেন্ট ঢোকানো কীভাবে সম্ভব? এজন্য আমার সার্জন অনেক বেশি দরকার।
ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং জনবলের কথা বলছেন, রিসার্চের কথাটা যদি বলতেন:
অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী: প্রতিটি মেডিকেল কলেজ, যেখানে এমডি কার্ডিওলজি আছে, তাদের প্রত্যেকের একটা করে থিসিস করতে হয়। এই থিসিসগুলো কিন্তু রিসার্চ না করে হয় না। আরেকটা কথা, আজকাল বলা হচ্ছে সব হার্টের রোগীর ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন দেওয়াটা ক্লাস ওয়ান ইন্ডিকেশন। যে মাল্টিন্যাশনাল গবেষণার ওপর নির্ভর করে এই গাইডলাইন দেয়া হয়েছে, সেই গবেষণার হায়েস্ট নাম্বার অব পেশেন্ট কন্ট্রিবিউট করেছে এই ইনস্টিটিউট। এ ছাড়া ইন্টারহার্ট স্টাডির কথা বললাম। এসব মিলে ছোট ছোট কাজ হচ্ছে। বড় কাজ করতে আর্থিক এবং অবকাঠামোগত সাপোর্ট যেটা থাকা দরকার, সেটা কিন্তু আমাদের নেই।
আরেকটা দুঃখের কথা বলব, যে ছেলে রিসার্চ করছে সে একজন ক্লিনিশিয়ানও বটে। তার এই রিসার্চের জন্য তাকে কি আমি মূল্যায়ন করছি? আমাদের কিন্তু এই জিনিসগুলো নেই। ঢাকা মেডিকেলের নিউক্লিয়ার মেডিসিন সেন্টারের ডিরেক্টর দুঃখ করছিলেন। তিনি খুব সুন্দর একটা প্রপোজাল তৈরি করেছেন। এজন্য তার দরকার ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু তাকে দেওয়া হলো ৮ লাখ টাকা। তিনি আমাকে বললেন, স্যার আমাকে কেন দিল? আমি এটা দিয়ে কী করব? আমার তো মেশিন কিনতেই ৬ লাখ টাকা লাগবে।
হৃদরোগ থেকে বাঁচতে জীবনমান উন্নয়নের জন্য করণীয় কিছু বলবেন?
অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী: আমাদের খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনা উচিত। আমি তো বলি, যেটা বেশি মজা লাগে সেটা কম খাবেন। তেল, চিনি, লবণ- এই তিনটা জিনিস কম খেলে কিন্তু আমার প্রেসার, কোলেস্টেরল এবং ওজন কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া স্মোকিংটা ছাড়া, একটু কায়িক পরিশ্রম করা, ঘুমটা ঠিক করা আর মনটা ফ্রেশ রাখার জন্য কিছু শখ তৈরি করা উচিত। অর্থাৎ ভালো অভ্যাসগুলো বেশি করে তৈরী করা উচিত।