
X
ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ
জোনায়েদ মানসুর: দেশের ব্যাংকিং খাত যখন উচ্চ খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট, সুশাসনের অভাব ও গ্রাহক আস্থার সংকটে টালমাটাল, তখন ব্যতিক্রমী সাফল্যের গল্প লিখছে শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংক শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। মুনাফা, আমানত, আমদানি-রপ্তানি, ডিজিটাল ব্যাংকিং ও গ্রাহকসেবায় ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে ব্যাংকটি দেশের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাতারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। ব্যাংকটির ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী (২০০১ সালের ১০ মে ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু) উপলক্ষে সামগ্রিক ব্যাংকিং পরিস্থিতি, খেলাপি ঋণ, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের সুশাসন, ডিজিটাল লেনদেন, সাইবার নিরাপত্তা, এসএমই ও কৃষিখাতে বিনিয়োগসহ নানা সমসাময়িক বিষয়ে দৈনিক বাংলাদেশ বুলেটিনের বিশেষ প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ। সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-
বাংলাদেশ বুলেটিন: দেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখে। এই পরিস্থিতিতে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান অবস্থানকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: আলহামদুলিল্লাহ, সার্বিকভাবে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক এখন অত্যন্ত স্থিতিশীল ও শক্ত অবস্থানে রয়েছে। দেশের ব্যাংক খাত যখন খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট ও আস্থাহীনতার চাপে রয়েছে, তখন আমরা ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি।
বর্তমানে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমরা শীর্ষ অবস্থানে আছি। শুধু তাই নয়, দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যেও আমাদের অবস্থান প্রথম সারিতে। গত বছরের তুলনায় আমাদের মুনাফা দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৫ সালে যেখানে মুনাফা ছিল ১৬২ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬৮ কোটি টাকায়। আমানত প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০ শতাংশ, বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৯ শতাংশ, আমদানি প্রবৃদ্ধি ২৪ শতাংশ এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। এসব সূচকই প্রমাণ করে আমরা একটি মজবুত ও টেকসই ব্যাংক হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছি।
বাংলাদেশ বুলেটিন: বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ঋণখেলাপি। এটা যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে পুরো ব্যাংকিং খাত ঝুঁকির মুখে পড়বে। কিছু বড় গ্রুপ ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে ফেরত দিচ্ছে না। এতে ব্যাংকের তারল্য, আমানতকারীদের আস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা শুরু থেকেই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার প্রকৃতি এবং পরিশোধ সক্ষমতা গভীরভাবে যাচাই করি। এ কারণেই গত ৬-৭ বছরে আমাদের নতুন কোনো বড় ঋণ খেলাপি হয়নি। আমরা মনে করি, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া এ সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ বুলেটিন: শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো নিয়ে মানুষের মধ্যে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, সেটাকে কীভাবে দেখছেন?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। কিছু ব্যাংকে করপোরেট গভর্নেন্স না মানা, শরিয়াহ নীতির অপব্যবহার এবং অর্থ পাচারের কারণে পুরো ইসলামী ব্যাংকিং খাত প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অথচ ইসলামী ব্যাংকিং মানুষের আস্থা ও নৈতিকতার জায়গা থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আমরা মনে করি, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক পরিচালনায় দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-সুশাসন ও জবাবদিহিতা। মালিকপক্ষের বোর্ড এবং শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড-দুইটিকেই সমান শক্তিশালী হতে হবে। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে শরিয়াহ বোর্ডের মতামত যথাযথ গুরুত্ব পায় না। এ সংস্কৃতি পরিবর্তন জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর জন্য কিছু নীতিগত সংস্কার এনেছে। আমরা আশা করছি, এতে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও আস্থা আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ বুলেটিন: ডিজিটাল ব্যাংকিং নিয়ে আপনারা কী ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: আমরা এখন ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। ভবিষ্যতের ব্যাংকিং হবে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর। একজন গ্রাহক যেন ঘরে বসেই অ্যাপের মাধ্যমে হিসাব পরিচালনা, ফান্ড ট্রান্সফার, ঋণের আবেদন, বিল পরিশোধসহ সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা নিতে পারেন-সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি। বর্তমানে আমাদের রয়েছে রিয়েল টাইম অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপভিত্তিক লেনদেন, ইসলামী ক্রেডিট কার্ড, ২৪ ঘণ্টার এটিএম সেবা, এসএমএস পুশ-পুল সার্ভিস এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা। প্রযুক্তিকে যত সহজ ও নিরাপদ করা যাবে, মানুষ তত বেশি নগদ টাকার পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেনে আগ্রহী হবে। আমরা একটি ক্যাশলেস অর্থনীতি গঠনে ভূমিকা রাখতে চাই।
বাংলাদেশ বুলেটিন: ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিস্তারের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা এখন বড় ইস্যু। এ বিষয়ে আপনারা কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: সাইবার নিরাপত্তা এখন ব্যাংকের লাইফলাইন। আমরা এ বিষয়ে কোনো আপস করি না। ইতোমধ্যে আমাদের সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো ও সফটওয়্যার আপডেট করা হয়েছে। ডিজাস্টার রিকভারি সিস্টেম আধুনিকায়ন করা হয়েছে। সম্ভাব্য সাইবার হামলা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মানের সিকিউরিটি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকে কোনো বড় সাইবার জটিলতা তৈরি হয়নি। আমরা চাই গ্রাহকের তথ্য ও অর্থ সর্বোচ্চ নিরাপদ থাকুক।
বাংলাদেশ বুলেটিন: এসএমই, কৃষি ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আপনাদের পরিকল্পনা কী?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: আমরা বড় করপোরেট ঋণের পাশাপাশি ছোট ও উৎপাদনমুখী ঋণে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। বিশেষ করে সিএমএসএমই, কৃষি, গবাদিপশু, মসলা, ফলজ উৎপাদন ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা চালু রয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের অনেক ক্ষেত্রে জামানতবিহীন ঋণও দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিএমএসএমই খাতভুক্ত। দেশের কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ এই খাত সৃষ্টি করে। তাই অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ বুলেটিন: বর্তমানে ব্যাংকের আর্থিক সূচক সম্পর্কে কিছু বলুন।
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: বর্তমানে আমাদের আমানতের পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা এবং বিনিয়োগ প্রায় ২৯ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। আমদানি বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা এবং রপ্তানি প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। গ্রাহক সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে আমাদের সমন্বিত শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ১ টাকা ১২ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ টাকা ৪ পয়সা। শেয়ার প্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ২৪ টাকা ৯ পয়সা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ক্রেডিট রেটিংয়েও আমরা শক্ত অবস্থানে রয়েছি।
বাংলাদেশ বুলেটিন: গ্রাহকসেবা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি কী?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: আমরা মনে করি, গ্রাহকরাই ব্যাংকের প্রাণ। তাই গ্রাহকসেবায় কোনো ধরনের হয়রানি বরদাশত করা হয় না। প্রত্যেক শাখা ব্যবস্থাপককে এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে আমরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ত্রাণ, দরিদ্র সহায়তা এবং শিক্ষাবৃত্তি কার্যক্রম পরিচালনা করছি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে এজেন্ট ব্যাংকিং ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ করছি।
বাংলাদেশ বুলেটিন: আগামী দিনের জন্য শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য কী?
মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ: আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে—সুশাসন, প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপদ ব্যাংকিং এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। আমরা চাই, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক শুধু ইসলামী ব্যাংকিংয়েই নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতেই একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হোক। আমরা ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণ, খেলাপি ঋণ আদায় জোরদার, গ্রাহকসেবা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখতে চাই।