প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির জন্য কেমন হওয়া উচিত নতুন বাজেট?

সাকিফ শামীম

অর্থ-বানিজ্য

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে হলে শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ লজিস্টিক্স ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর

2026-05-14T17:34:04+00:00
2026-05-14T17:34:04+00:00
শুক্রবার ৭ আগস্ট ২০২৬ ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার ৭ আগস্ট ২০২৬
   
লজিস্টিক্স থেকে ডিজিটাল গভর্নেন্স
প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির জন্য কেমন হওয়া উচিত নতুন বাজেট?
সাকিফ শামীম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ৫:৩৪ পিএম   (ভিজিট : ১২৬)
কেমন হওয়া উচিত নতুন বাজেট?
X

কেমন হওয়া উচিত নতুন বাজেট?

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে হলে শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ লজিস্টিক্স ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন এবং কার্যকর ডিজিটাল গভর্নেন্স। বাংলাদেশ এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্যকার সমন্বয়ই আগামী অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট তাই শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং এটি হওয়া উচিত দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত রূপরেখা। 

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট এমন এক বাস্তবতায় প্রণীত হতে যাচ্ছে, যখন দেশের অর্থনীতি একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫–৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। এই বাস্তবতায় নতুন বাজেটকে শুধু ব্যয় ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দলিল হিসেবে নয়, বরং অর্থনীতিকে আরও দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বিনিয়োগবান্ধব করার একটি রূপকৌশল হিসেবে দেখতে হবে।

বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে লজিস্টিক্স ব্যয় মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ১৫–২০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যেখানে উন্নত অর্থনীতিতে এই হার সাধারণত ৮–১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ উৎপাদন থেকে পণ্য বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশ এখনও তুলনামূলক ব্যয়বহুল। চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক অতিরিক্ত চাপ, রেলভিত্তিক কার্গো পরিবহনের সীমাবদ্ধতা এবং ওয়্যারহাউজিং ব্যবস্থার দুর্বলতা রপ্তানি প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করছে। তাই ২০২৬–২৭ বাজেটে লজিস্টিক্স খাতে আলাদা কৌশলগত বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন।

বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক করিডোর, পায়রা ও মাতারবাড়ী বন্দর সংযোগ, ড্রাই পোর্ট, কোল্ড চেইন এবং মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্য পরিবহন সড়কপথনির্ভর, যা ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি সময়ও বৃদ্ধি করে। বাজেটে যদি রেলভিত্তিক কন্টেইনার পরিবহন এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহারে প্রণোদনা দেওয়া হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে লজিস্টিক্স ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। একইসাথে রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চলগুলোর জন্য বিশেষ লজিস্টিক্স জোন গড়ে তোলাও জরুরি।

নতুন বাজেটে ডিজিটাল গভর্নেন্সকে অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বর্তমানে ব্যবসা নিবন্ধন, ভ্যাট, কর, কাস্টমস এবং লাইসেন্স সংক্রান্ত অনেক সেবা ডিজিটাল হলেও এখনও পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত নয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ডাটা সমন্বয়ের অভাব এবং ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ার কারণে ব্যবসায়িক সময় ও ব্যয় বেড়ে যায়। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে “স্মার্ট বাংলাদেশ” বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে আগামী বাজেটে সরকারি সেবাগুলোকে একটি একীভূত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার জন্য বড় পরিসরে বিনিয়োগ প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল গভর্নেন্স কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে প্রশাসনিক ব্যয় ২০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। একইসাথে কর আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং রাজস্ব ফাঁকি কমবে। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৮–৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায়ও কম। তাই করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে ডিজিটাল ট্যাক্স প্রশাসন শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। AI-ভিত্তিক কর নিরীক্ষা, ই-ইনভয়েসিং এবং স্বয়ংক্রিয় ভ্যাট ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

২০২৬–২৭ বাজেটে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামো খাতেও অধিক মনোযোগ প্রয়োজন। বর্তমানে দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সংখ্যা ১৩ কোটির বেশি হলেও গ্রামীণ অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবার সীমাবদ্ধতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। তাই বাজেটে ৫জি অবকাঠামো, জাতীয় ডাটা সেন্টার, ক্লাউড সেবা এবং সাইবার নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একইসাথে স্টার্টআপ, ফিনটেক এবং AI-ভিত্তিক উদ্ভাবনী খাতের জন্য ট্যাক্স সুবিধা ও ভেঞ্চার ফান্ড গঠন করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রেও বাজেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। এই নির্ভরতা কমাতে ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প, আইসিটি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতকে কর-সুবিধা ও অবকাঠামোগত সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ডিজিটাল ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন এবং দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স নিশ্চিত করা গেলে অপ্রচলিত রপ্তানি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে বাজেট বাস্তবায়নে। বাংলাদেশে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অনেক প্রকল্পই সময়মতো শেষ হয় না, যার ফলে ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যায় না। তাই আগামী বাজেটে প্রকল্প মনিটরিং, ই-গভর্নেন্সভিত্তিক ট্র্যাকিং এবং সরকারি ক্রয়ে পূর্ণ ডিজিটাল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। এতে দুর্নীতি ও অপচয় কমবে এবং বিনিয়োগের কার্যকারিতা বাড়বে।

একইসাথে মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বর্তমানে বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী একটি বড় সম্ভাবনা হলেও দক্ষতার ঘাটতি এখনও বড় বাধা। তাই বাজেটে কারিগরি শিক্ষা, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, AI, ডাটা অ্যানালিটিক্স এবং সাইবার নিরাপত্তাভিত্তিক প্রশিক্ষণে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। শিল্প ও শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা গেলে আগামী প্রজন্মকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে।

সবশেষে বলা যায়, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে এটি কেবল স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারে। লজিস্টিক্স দক্ষতা, ডিজিটাল গভর্নেন্স, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ—এই চারটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশ আগামী দশকের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে। সঠিক নীতি, বাস্তবভিত্তিক বরাদ্দ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

সাকিফ শামীম, এফএসিএইচই, এফএলএমআই
চেয়ারম্যান, Center for Strategic and Economic Research (CSER)
ম্যানেজিং ডিরেক্টর, Labaid Hospital Group and Lifeplus Group






Loading...
Loading...


অর্থ-বানিজ্য এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : bulletinadbd@gmail.com
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy