
X
: ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি
ছোট ভুলেরও যেন কোনো ক্ষমা নেই। প্রীতি ম্যাচের ছোট্ট একটা ভুল পাস যেন জাতীয় জরুরি পরিস্থিতির রূপ নেয়। অল্প দিনের অভিজ্ঞতায় কার্লো আনচেলত্তির চোখে এভাবেই ধরা দিয়েছে ব্রাজিলের ফুটবল। সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনি বুঝতে পারছেন, পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের সাম্প্রতিক সমস্যার পেছনে দায় প্রতিভার ঘাটতি নয়, বরং খেলোয়াড়দের ওপর প্রত্যাশার প্রবল চাপ।
এক মাসেরও কম সময়ের মধ্েয শুরু হবে বিশ্বকাপ। এই সময়ে বিশ্ব মঞ্চে ২৪ বছরের খরা কাটাতে ব্রাজিল দলকে পথ দেখালেন আনচেলত্তি। রিও দে জেইরোতে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অভিজ্ঞ ইতালিয়ান কোচ বললেন, চাপকে পরিণত করতে হবে জ্বালানি হিসেবে।
তিনি বলেন,‘ সত্িয বললে এই বছর আমি যা লক্ষ্য করেছি তা হলো, প্রবল চাপ; খেলোয়াড়দের ওপর প্রচুর চাপ রয়েছে। আমার মনে হয় যে, খেলোয়াড়রাও নিজেদের ওপর অনেক চাপ তৈরি করে, কখনও কখনও সেটা অতিরিক্ত। তাই, চাপ ও উদ্বেগের নিচে চাপা পড়ে যায় আনন্দ, ব্রাজিলিয়ানদের প্রাণশক্তি ও সৃজনশীলতা।’
সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলোতে ব্রাজিলের ব্যর্থতার পেছনে ভঙ্গুর মানসিক অবস্থা ও কৌশলগত ত্রুটির কথাই বেশি এসেছে। প্রত্যাশার বিপুল চাপের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে প্রীতি ম্যাচের প্রসঙ্গ টেনে আনলেন আনচেলত্তি,‘ কিছু প্রীতি ম্যাচে আমি এটা দেখেছি... কোনো প্রীতি ম্যাচে কোনো সতীর্থের একটি ভুল যেন হয়ে ওঠে একটি ট্র্যাজেডি। এগুলো এড়ানোর জন্য আমাদের একটি পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। কারণ, চাপ অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। চাপ ভালোভাবে সামাল দেওয়া মানে আরও বেশি উদ্দীপনা কাজ করা এবং নিজেদের মধ্যে আরও বেশি সৌহার্দ্য থাকা। কারণ, আপনি চাপ ভাগ করে নিতে পারেন। তখন আপনার ওপর চাপ ততটা ভারী হবে না।’
ব্রাজিলের আত্মপরিচয়েয়র জায়গায় হাত দিতে চান না রেয়াল মাদ্রিদের সাবেক কোচ। তবে আধুনিক ফুটবলের তীব্রতার মধ্েয টিকে থাকার মতো উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে চান তিনি। সেই পুরনো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাকে- ব্রাজিলের কী আনন্দদায়ী ফুটবল খেলা উচিত নাকি স্রেফ জেতা উচিত? সরাসরি এর কোনোটার পক্ষ নিলেন না আনচেলত্তি।
“ব্রাজিলের খেলোয়াড় ও ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের কখনও তাদের অসাধারণ গুনাবলী হারানো উচিত নয় তা হলো- সৃষ্টিশীলতা, আনন্দ ও প্রাণশক্তি।
ব্রাজিল দলের কাছ থেকে আনচেলত্তি যা চান, এর সবচেয়ে পরিষ্কার চিত্র ফুটবল মাঠ নয়, তিনি বরং দেখেছেন কার্নিভালে।চলতি বছর এখানে এটাই ছিল আমার প্রথম কার্নিভাল। আমি দেখেছি, এখানে বাঁধভাঙা আনন্দ, দারুণ প্রাণশক্তি। কারণ, সূর্যোদয় পর্যন্ত নাচছিল মানুষ। একই সঙ্গে জনপ্রিয় একটি উৎসব, যেটার সঙ্গে সবাই সম্পৃক্ত অনুভব করে। আপনি যদি এখানে এই রিওতে প্যারেড দেখেন, এখানে সব কিছু নিখুঁতভাবে সংগঠিত- টাইমিং, সঙ্গীত সবকিছুই নিখুঁত। এগুলো ব্রাজিলের মানুষের বৈশিষ্ট্য, যা আমি কার্নিভালে দেখেছি এবং ব্রাজিল জাতীয় দলে যা আমি আনতে চাই: আনন্দ, প্রাণশক্তি, সংগঠন, নিবেদন ও মনোভাব।’
ব্রাজিল দল আভা হারিয়েছে, এই ধারণার সঙ্গে একমত নন আনচেলত্তি। ক্লাব ফুটবলের দারুণ সফল এই কোচের মতে, কয়েক প্রজন্ম ধরে দেশটির ফুটবল ঘিরে যে সাফল্যের রহস্য জন্ম নিয়েছে, তা এই অল্প কিছুদিনের হতাশাজনক পারফম্যান্সে মুছে যাবে না। ব্রাজিলে বিশেষ কিছু একটা আছে এবং সবসময় থাকবে। দারুণ সব প্রতিভা বের করে আনার ক্ষমতা ব্রাজিলের আছে এবং সবসময় ছিল। এমনকি এখনও অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় এই দেশটি বেশি প্রতিভা তৈরি করে।’
ফুটবলে দ্রুত পরিবর্তন এসেছে এবং এখনও খেলাটি দ্রুত বদলাচ্ছে। ইতালিয়ান কোচ মনে করেন, এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটু পিছিয়ে আছে ব্রাজিল। সবসময় যেমন ছিল, এখনও সেই একই মান ব্রাজিলের আছে। তবে সেই সংগঠিত সৃজনশীলতা, নিবেদন ও মনোভাবকে আপনার সমর্থন করতে হবে। প্রতিভা গুরুত্বপূর্ণ, তবে আরেক প্রতিভাকে পরাস্ত করতে হলে, (দলগতভাবে) সংগঠিত হতে হবে। এবং হ্যাঁ, আমরা এটি ঘটাতে যাচ্ছি, কারণ আপনি সংগঠিত হওয়া শেখাতে পারেন, কিন্তু প্রতিভা শেখতে পারবেন না।’
ব্রাজিলের ফুটবল নিয়ে সবচেয়ে উচ্চারিত কথার একটি ‘জোগো বোনিতো।’ এই প্রসঙ্গে আনচেলত্তি দিলেন নিজস্ব ব্যাখ্যা,‘এটা হয়তো কোনো ধরনের দক্ষতা হতে পারে কিংবা হতে পারে দলীয় প্রচেষ্টা, সম্মিলিত নিবেদন, বল দখলে থাকা অবস্থায় দুর্দান্ত দলীয় মনোভাব এবং প্রত্েযকের কঠোর পরিশ্রম।’
অনেকেই ফেভারিটের কাতারে রাখছে না ব্রাজিলকে। তাতে কোনো আপত্তি নেই আনচেলত্তির। বরং ব্রাজিলকে ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে দেখাটা ভালো লেগেছে তার,‘ আমি মনে করি, এই বিশ্বকাপে কোনো পরিষ্কার ফেভারিট নেই। কারণ, সব দলেরই নিজস্ব সমস্যা রয়েছে। কোনো নিখুঁত দল নেই। আমার বিশ্বাস সবচেয়ে প্রাণবন্ত দলটা বিশ্বকাপ জিতবে।’
নিজেদের মর্যাদা ফিরে পেতে ব্রাজিলের কী করতে হবে, সেটাও রাফিনহা, ভিনিসিয়াস জুনিয়রদের বলে দিলেন আনচেলত্তি।