
X
ফুটবল বিশ্বকাপের ট্রফি
আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ফুটবল বিশ্ব। তবে এবার মাঠের লড়াই শুরুর আগেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে উত্তর আমেরিকার প্রচণ্ড দাবদাহ। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠেয় এই টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে ফিফাকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন একদল বিশ্বসেরা বিজ্ঞানী। তাদের মতে, ফিফার বর্তমান তাপ-নিরাপত্তা ব্যবস্থা একেবারেই ‘অপ্রতুল’, যা ফুটবলারদের জীবনকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
স্বাস্থ্য, জলবায়ু এবং ক্রীড়া পারফরম্যান্স বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একটি খোলা চিঠিতে বলা হয়েছে যে, ফিফার বর্তমান নির্দেশিকাগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং একে কোনোভাবেই যৌক্তিক বলা চলে না। তারা ফিফাকে আরও শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করার আহ্বান জানিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘতর ‘কুলিং ব্রেক’ বা বিরতি এবং চরম আবহাওয়ায় খেলা বিলম্বিত বা স্থগিত করার বিষয়ে আরও স্পষ্ট নীতিমালা।
যৌথ আয়োজিত গ্রীষ্মকালীন টুর্নামেন্টে তাপপ্রবাহ একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা করে গবেষকরা সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, মোট ১৬টি স্টেডিয়ামের মধ্যে ১৪টিতেই তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর মেক্সিকোর কিছু অংশে দিনের গড় তাপমাত্রা সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে, যা তীব্র গরমের সময় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যেতে পারে।
যখন তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বাতাসের গতিবেগ এবং সূর্যালোকের তীব্রতা একত্রে বিবেচনা করা হয়, তখন এই আয়োজক শহরগুলোতে থাকা খেলোয়াড়দের শরীরে চরম মাত্রার ‘হিট স্ট্রেস’ বা তাপজনিত শারীরিক অসুস্থতার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। তবে ফিফা জানিয়েছে, তারা খেলোয়াড়, রেফারি, ভক্ত, স্বেচ্ছাসেবক এবং কর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ এবং টুর্নামেন্ট পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই জলবায়ুজনিত ঝুঁকিগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, ফিফা খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য নিয়ে এক ধরনের ‘বেপরোয়া’ মনোভাব দেখাচ্ছে। এই খোলা চিঠির সমন্বয়কারী এবং ‘নিউ ওয়েদার ইনস্টিটিউট’-এর পরিচালক অ্যান্ড্রু সিমস বিবিসি স্পোর্টকে বলেন,
‘খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়, কারণ শরীর অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে গেলে খুব দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আমাদের আশঙ্কা, ফিফা খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে এক ঝুঁকিপূর্ণ খেলা খেলছে।’
কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডগলাস কাসা নিজেও এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। তিনি জানান যে ফিফার বর্তমান নির্দেশিকাগুলোর বড় একটি অংশই আদর্শ মানের ধারেকাছে নেই। তার মতে,
‘প্রতি অর্ধে পানির বিরতি (হাইড্রেশন ব্রেক) অবশ্যই তিন মিনিটের চেয়ে বেশি হতে হবে—এটি অন্তত পাঁচ মিনিট, আর সম্ভব হলে ছয় মিনিট হওয়া উচিত। আমরা আশা করছি এই খোলা চিঠিটি ফিফাকে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই তাদের তাপ-সংক্রান্ত নির্দেশিকাগুলো আপডেট করতে বাধ্য করবে।’
২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে উদ্বেগের কারণ মূলত চরম আবহাওয়ার পূর্বাভাস। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়ায় প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের পাশাপাশি বজ্রঝড়, এমনকি দাবানলের কারণে বাতাসের নিম্নমানের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’ -এর নতুন এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৯৪ সালে একই মহাদেশে আয়োজিত বিশ্বকাপের তুলনায় এবারের আসরে খেলোয়াড় এবং দর্শকদের অনেক বেশি কষ্টকর তাপ ও আর্দ্রতার মুখোমুখি হতে হবে।
বর্তমানে ফিফা খেলোয়াড়দের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে, সেগুলো মূলত আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ এবং মাঠের ভেতর তাৎক্ষণিক স্বস্তি প্রদানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ফিফার ‘খেলোয়াড় কল্যাণে অঙ্গীকারের’ অংশ হিসেবে প্রতিটি ম্যাচের দুই অর্ধে তিন মিনিটের বাধ্যতামূলক ‘কুলিং ব্রেক’ বা বিরতির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা আবহাওয়ার পরিস্থিতি যাই হোক না কেন কার্যকর থাকবে। এছাড়া খোলা মাঠে আয়োজিত সব ম্যাচের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত কর্মকর্তা এবং বদলি খেলোয়াড়দের জন্য থাকছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বেঞ্চের ব্যবস্থা।
তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য ফিফা খেলাধুলার জগতে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি ‘ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার’ ব্যবহার করে। এটি মূলত তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং বাতাসের প্রভাব মিলিয়ে মানবদেহের ওপর তাপের প্রকৃত চাপ পরিমাপ করে। অ্যাথলেটদের জন্য এই পরিমাপে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে একটি সতর্কসংকেত হিসেবে ধরা হয়। ফিফার জরুরি চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী, যদি এই মান ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বা তার বেশি হয়, তবে তাপজনিত অসুস্থতা রোধে আয়োজকদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
খেলোয়াড়দের পাশাপাশি দর্শকদের স্বস্তির কথা মাথায় রেখেও কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে ফিফা। অতিরিক্ত গরমের পূর্বাভাস থাকলে দর্শকরা নিজেদের সাথে সিল করা পানির বোতল নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশের অনুমতি পাবেন। এছাড়া ভেন্যুগুলোতে ছায়াযুক্ত এলাকা বৃদ্ধি, কুয়াশা তৈরির যন্ত্র কুলিং বাস এবং অতিরিক্ত পানি সরবরাহের মতো বিশেষ ব্যবস্থা চালু করা হবে।