
X
তানজিদ হাসান তামিম
ম্যাচের পরিস্থিতি যেমনই হোক, লক্ষ্য থাকবে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট। শরীরী ভাষায় কখনোই দ্বিধা বা পিছু হটার ইঙ্গিত থাকবে না। ব্যাট হাতে থাকবে নির্ভীক মানসিকতা। ক্রিকেট বিশ্বের কাছে এই দর্শনই এখন পরিচিত ‘বাজবল’ নামে। নতুন করে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটেও কি সেই দর্শনের ছোঁয়া লেগেছে!
ইংল্যান্ডের মতো পুরোপুরি বাজবল না হলেও, অন্তত পুরোনো রক্ষণাত্মক ব্যাটিং চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ দল। সেই ভাবনারই অংশ হিসেবে প্রথমবার টেস্ট স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছেন তানজিদ হাসান তামিম। ঢাকা টেস্টে অপেক্ষার পর সিলেটে হয়ে গেল তার অভিষেক। তার এই অভিষেকের মধ্য দিয়ে যেন নতুন এক যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট।
যদিও নিজের অভিষেক ম্যাচটি সেই অর্থে রাঙাতে পারেননি তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগ্রাসী শুরু করেও ইনিংসটি বড় করতে পারেননি জুনিয়র তামিম। আব্বাসের করা শর্ট বল অফ স্টাম্পের বাইরে উঠে আসে বুকসমান উচ্চতায়। তানজিদের জন্য এটি ছিল একেবারেই অপ্রয়োজনীয় শটের চেষ্টা। মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্তেই শেষ হয়ে যায় তার ইনিংস। মিড-অনের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারতে গিয়ে টাইমিং গড়বড় করে ফেলেন তিনি। ব্যাটের ওপরের কানায় লেগে বল উঠে যায় আকাশে। সহজ ক্যাচ নেন বোলার নিজেই। ৩৪ বলে ২৬ রানেই শেষ হয় তানজিদের অভিষেক ইনিংস।
তানজিদের ব্যাটিংয়ের ধরন সহজাতভাবেই কিছুটা আগ্রাসী। প্রথম বল থেকেই তার শরীরী ভাষায় থাকে আত্মবিশ্বাস। সুযোগ পেলেই আক্রমণে যাওয়ার প্রবণতা তার মধ্যে বেশি। সাদা বলের ক্রিকেটে সেটি অনেকবারই দেখা গেছে। তবে বর্তমান নির্বাচক প্যানেল তাকে শুধু সীমিত ওভারের ক্রিকেটে আটকে না রেখে লাল বলের ক্রিকেটেও ছড়িয়ে দিতে চায়।
গত কয়েক বছরে ইংল্যান্ড টেস্ট ক্রিকেটকে দেখিয়েছে নতুনভাবে। সেখানে উইকেট বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। ভয়হীন ক্রিকেট, ইতিবাচক ব্যাটিং আর প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার দর্শন বদলে দিয়েছে টেস্টের চেনা ছক। বাংলাদেশও সেই সাহসী পথেই হাঁটার ইঙ্গিত দিল।
তানজিদের প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারও সেই বিশ্বাসকে উড়িয়ে দেয় না। বয়স কম হলেও লাল বলের ক্রিকেটে ইতোমধ্যে পাঁচটি সেঞ্চুরি করেছেন তিনি। জাতীয় ক্রিকেট লিগে খেলেছেন একাধিক ভালো ইনিংস। ২৫টি ম্যাচে ৪০.৭২ গড়ে ১৭৯২ রান করে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন এই বাঁহাতি। তার নামের পাশে আছে পাঁচটি সেঞ্চুরি ও ছয়টি ফিফটি। সর্বশেষ মৌসুমেও খেলেছেন ১৪১ রানের বড় ইনিংস, যা নির্বাচকদের নজর কাড়ে।
বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে ওপেনিং বরাবরই অস্থির একটি জায়গা। বছরের পর বছর এখানে নতুন মুখ এসেছে, আবার হারিয়েও গেছে। বেশির ভাগ ওপেনারের খেলায় ছিল কিছুটা খোলসবন্দি মানসিকতা। সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালই কেবল লাল বলের ক্রিকেটেও ধারাবাহিকভাবে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতেন। নতুন করে সেই ভাবনায় যুক্ত করা হয়েছে তানজিদকে।
তানজিদের মধ্যে সেই সাহস আছে। তবে এই ধরনের ক্রিকেটে ঝুঁকিও কম নয়। আগ্রাসী ব্যাটিং মানেই ভুলের সম্ভাবনা বেশি। যে ভুলে অভিষেক ম্যাচে বড় রান হলো না তার। যদিও আধুনিক টেস্ট ক্রিকেট এখন অনেকটাই বদলে গেছে। পাঁচ দিন শুধু টিকে থাকার ক্রিকেট নয়, ম্যাচের ছন্দ কেড়ে নেওয়ার ক্রিকেটেই এখন বিশ্বাস বড় দলগুলোর। বাংলাদেশও হয়তো বুঝতে শুরু করেছে, শুধু রক্ষণাত্মক ক্রিকেট খেলে আর এগোনো যাবে না।
ফলে সিলেট টেস্ট শুধু তানজিদের অভিষেকের গল্পই লিখল না, এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে নতুন এক দর্শনের সূচনাও হয়ে থাকল। যেখানে ওপেনার শুধু বল ছেড়ে দেবেন না, পাল্টা আঘাতও করবেন। তানজিদকে প্রথমবার টেস্ট স্কোয়াডে সুযোগ দেওয়ার পর প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন বলেছিলেন, ‘আমরা যখন কোনো খেলোয়াড় নির্বাচন করি, তখন তার খেলার ধরনটাকেই গুরুত্ব দিই। যাকে দলে নেওয়া হচ্ছে, তার কাছ থেকে সেই ধরনের ক্রিকেটই খেলতে চাই। আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে হলে সেই ধরনের খেলোয়াড়ই প্রয়োজন।’
তানজিদের ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নের বীজ বোনা শুরু হয়েছিল তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়। ২০১৬ সালের আগে পর্যন্ত বগুড়া জেলার হয়ে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট খেলেছেন তিনি। এরপর ২০১৭ সালে রাজশাহীর বাংলা ট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হন। সাবেক ক্রিকেটার খালেদ মাহমুদ সুজন এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কোচ। সেখান থেকে উত্তরা ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে অংশ নেন। এই ক্লাবের হয়ে লিস্ট ‘এ’ ম্যাচের পাশাপাশি খেলেছেন দুটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচও। ২০২০ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি।
বাংলাদেশের ব্যাটিং স্তম্ভ মুশফিকুর রহিমের জন্মও বগুড়ায়। নিজের এলাকার ছেলে বলেই হয়তো নিজ হাতে তানজিদকে পরিয়ে দিলেন টেস্ট ক্যাপ। ক্যাপ পরানোর আগে তানজিদের উদ্দেশে কিছু বার্তাও দেন এই উইকেটকিপার ব্যাটার, ‘আমি আশা করব, তুমি লাল বলের ক্রিকেটে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবে। ইনশাআল্লাহ, যেহেতু তুমি বগুড়ার ছেলে, তাই এটা আমার জন্য খুবই বিশেষ মুহূর্ত। আমি আশা করব, আগামী ১০-১৫ বছর তুমি বাংলাদেশ দলকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সার্ভিস দেবে ইনশাআল্লাহ।’