
X
সময় পেরিয়েছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু মুশফিকুর রহিম এখনও দলের ভরসার প্রতিশব্দ হয়েই আছেন, উপহার দিলেন তিনি আরেকটি সেঞ্চুরি।
বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে শততম টেস্ট খেলা মুশফিকুর রহিম এবার গড়লেন আরেক অনন্য রেকর্ড। ক্রিকেটের তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ১৬ হাজার রান পূর্ণ করেছেন এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। বাংলাদেশের আর কোনো ক্রিকেটারের নেই ১৬ হাজার রানের রেকর্ড।
সব ফরম্যাট মিলিয়ে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড আগে থেকেই ছিল মুশফিকুর রহিমের। সিলেট টেস্টে তার সামনে সুযোগ ছিল আরেক কীর্তি গড়ার। সুযোগ হাতছাড়া করেননি এই উইকেটরক্ষক ব্যাটার। ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ২৩ রান করা মুশফিক দ্বিতীয় ইনিংসে খেলতে থাকেন আপনতালে।
সিলেটে তৃতীয় দিনের চা বিরতিতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ৯০ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। তাতেই ছাড়িয়েছেন ১৬ হাজার রান। বর্তমানে মুশফিকের আন্তর্জাতিক রান সংখ্যা ১৬ হাজার ৫৮। বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় তার অবস্থান এক নম্বরে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মুশফিকের রয়েছে ২২টি সেঞ্চুরি ও ৮৫টি ফিফটি। তার গড় প্রায় ৩৫। মুশফিকুর রহিম খেলেছেন মোট ৪৭৮টি ম্যাচ।
রান সংগ্রাহকের তালিকায় মুশফিকের পরেই অবস্থান তামিম ইকবালের। ৩৮৭ ম্যাচে তামিম করেছেন ১৫ হাজার ১৯২ রান। ৩৫.৪৫ গড়ে খেলা তামিমের ঝুঁলিতে আছে ২৫টি সেঞ্চুরি ও ৯৪টি ফিফটি। এছাড়া সাকিব আল হাসান ১৪ হাজার ৭৩০, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ১১ হাজার ৪৭ ও লিটন কুমার দাস করেছেন ৮ হাজার ৮৪১ রান।
শট খেলে বলের দিকে এক ঝলক তাকিয়েই মুশফিক বুঝে গেলেন, বাউন্ডারি হচ্ছে। বল সীমানা ছোঁয়ার আগেই শুরু হলো তার উদযাপন। দু হাত ছড়িয়ে চিৎকার করলেন। বোলার মোহাম্মাদ আব্বাসের মুখের ওপর গিয়ে হুঙ্কার ছুড়লেন। ব্যাট তুলে ধরার বদলে মাঠে ফেলে দিলেন প্রবল আক্রোশে। উঁচিয়ে ধরলেন হেলমেট। সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন তো ছিলই। সব মিলিয়ে দীর্ঘক্ষণ চলল উদযাপন।
আরও একটি শতরান, আরও একবার সবার ওপরে মুশফিক। এরকম বুনো উদযাপন আগেও দু-একবার দেখা গেছে মুশফিকের। তবে এবার তার খ্যাপাটে উদযাপনের পেছনে গল্পও আছে। সেঞ্চুরির আগে তার সঙ্গে বেশ এক চোট লেগে গিয়েছিল পাকিস্তানি অধিনায়ক শান মাসুদের। সেটির সূত্র ধরে মুখোমুখি হয়ে পড়েন তাইজুল ইসলাম ও সাউদ শাকিল। এসবই নিশ্চয়ই তাতিয়ে দিয়েছিল মুশফিককে।
অবশ্য তার ইনিংসটি যেমন, যেভাবে তিনি খেলেছেন এবং দল যে অবস্থানে আছে, তাতেও এরকম বাঁধনহারা উদযাপন হতেই পারে। লিটন দাসের সঙ্গে তার শতরানে জুটি বাংলাদেশকে জয়ের অবস্থানে নিয়ে গেছে। আর তার সেঞ্চুরিটি পাকিস্তানকে ম্যাচ থেকে একরকম ছিটকে দিয়েছে।
তাকে একটি জায়গায় এককভাবে শীর্ষেও নিয়ে গেছে এই শতক। বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি শতরানের রেকর্ডে তার সঙ্গী ছিলেন মুমিনুল। ১৪ সেঞ্চুরিতে আপাতত মুশফিকই সবার ওপরে। আর এই ইনিংসের পথে বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ১৬ হাজার রানও পূর্ণ করেন তিনি।
এই রান, সেঞ্চুরি, পরিসংখ্যান আর রেকর্ডের খতিয়ান, এগুলো স্রেফ কিছু সংখ্যা নয়। এসবে মিশে আছে তার অনেক ঘাম, শ্রম, ত্যাগ, নিবেদন আর প্রতিজ্ঞা। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর মাঠের ভেতরে-বাইরে শৃঙ্খলার ছকে সাজানো জীবন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাটুনি, ছুটির সঙ্গে আড়ি, ক্লান্তির সঙ্গে লড়াই, প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা আর উঁচুতে ওঠার তাড়না।
এই সংখ্যাগুলো স্বাক্ষ্য দেবে তার নির্ভরতারও। দুই দশকের বেশি সময় হয়ে দলর ভরসা হয়ে থাকা। এই ইনিংসটিতেও মিশে আছে যেন তার ক্যারিয়ারের সবকিছুই। তৃতীয় তিন সকালে যখন ক্রিজে যান, জরুরি ছিল একটি জুটি। আকাশ ছিল মেঘলা, বল মুভ করছিল বেশ। পাকিস্তানি বোলাররাও দারুণ বল করছিলেন তখন। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বিদায় নিলেন দ্রুতই। মুশফিক ঠিকই সব সামলে নিলেন তার চওড়া ব্যাটে।
শুরুর সেই চ্যালেঞ্জিং সময় কাটিয়ে দিলেন বরাবরের মতোই আস্থায়। সময়ের সঙ্গে বাড়াতে থাকলেন রান। লিটন দাসের সঙ্গে গড়ে উঠল শতরানের জুটি। পঞ্চম বা এর নিচের জুটিতে এই নিয়ে সপ্তমবার শতরানের বন্ধন গড়লেন তারা। টেস্ট ইতিহাসের এখানে তাদের ওপরে আছে কেবল ইংল্যান্ডের জো রুট ও বেন স্টোকস জুটি (৮টি)।
লিটন যখন ফিরলেন, দল তখস শক্ত অবস্থানে। তবে মুশফিকের শেষ নয় সেখানেই। তাইজুল ইসলামকে নিয়ে পাকিস্তানকে পিষে ফেলার আয়োজন করলেন তিনি। চা-বিরতিতে যান তিনি ৯০ রান নিয়ে। বিরতির আগের ওভারেই শান মাসুদের সঙ্গে তার ও শাকিলের সঙ্গে তাইজুলের সেই ঘটনা। বিরতির পর মোহাম্মাদ আব্বাসের বল লাগে তার পায়ে। আম্পায়ার আউট না দেওয়ায় রিভিউ নেয় পাকিস্তান। বড় পর্দায় যখন দেখা গেল, বল চলে যাচ্ছিল স্টাম্পের একটু ওপর দিয়ে, বড় পর্দায় তাকিয়ে হতাশ হয়ে মাঠেই বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন পাকিস্তানিরা।
আর সেই হতাশা আরও বাড়িয়ে একটু পরই মুশফিক শতরানে পা রাখলেন ১৭৮ বলে। সেই উদযাপনের পর আবার নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে মনোযোগ দিলেন আবার নতুন করে। ইনিংস এগিয়ে নিলেন আরও কিছুটা দূর। পাকিস্তানের সম্ভাবনাও তাতে দূর থেকে দূর সরে যেতে থাকল আরও।
টেস্ট ক্রিকেটে তার ২১ বছর পূর্ণ হবে সপ্তাহখানেক পর। বাংলাদেশ ক্রিকেটের কত চড়াই-উৎরাই, কত উত্থান-পতনের স্বাক্ষী তিনি। দেশের ক্রিকেটের কত কিছু বদলে গেছেৃ প্রজন্ম বদলেছে, যুগ পেরিয়েছে, সময় গড়িয়েছে- কিন্তু মুশফিকুর রহিম আজও বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্যতার প্রতিশব্দ হয়ে আছেন।
ক্যাপশন :