
X
বাংলাদেশের বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম
‘তাইজুল ভাই হবে, আপনিই পারবেন’, তাইজুল বোলিংয়ে আসতেই পেছন থেকে এভাবেই তাকে অনুপ্রাণিত করছিলেন নাজমুল হোসেন শান্ত ও লিটন দাস। সিলেট টেস্টের পঞ্চম দিনের শুরুতে নাহিদ রানা ও তাসকিন আহমেদ বোলিংয়ে এসে কিছুটা বেশি রান দিয়ে ফেলেন।
পঞ্চম দিনে ৬৮ বলের লড়াইয়ে ৫৭ বলই ডমিনেট করেছে পাকিস্তান। এই সময় বাংলাদেশ বেশ কিছু সুযোগ তৈরি করলেও সেগুলো কাজে লাগাতে পারেনি। পানিপানের বিরতির পর তাইজুল দ্বিতীয় বলেই সাফল্য পান। এর ধারাবাহিকতায় ১১ বলের মধ্যে পাকিস্তান হারায় তিন উইকেট।
পুরো ইনিংসে দারুণ বোলিং করে ৬ উইকেট নিয়ে তাইজুল বাংলাদেশকে ইতিহাসের অংশ করেছেন। তাই তো তাইজুলকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন অধিনায়ক শান্ত।
কতটা বিশ্বাস থাকলে নতুন বল হোক বা পুরোনো; তাইজুলের হাতেই দায়িত্ব তুলে দেন অধিনায়ক। পেছন থেকে বারবার শোনা যায়, ‘আপনিই পারবেন।’ আর তাইজুলও ঠিকই পেরেছেন। সিলেট টেস্টে বাংলাদেশ যখনই কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে, তখনই ত্রাতার ভূমিকায় হাজির হয়েছেন এই বাঁহাতি স্পিনার।
অধিনায়ক শান্তও জানালেন তার ওপর দলের আস্থা কথা, ‘দীর্ঘ সময় বোলিং করতে গেলে মাঝে মাঝে একটু এদিক-ওদিক হতে পারে। কিন্তু আমরা সবাই মিলে ওর ওপর বাড়তি প্রত্যাশার চাপ দিই, যেন আরও ভালো করতে পারে। তারপরও ও যেভাবে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করছে, সেটা সত্যিই দেখতে ভালো লাগে।’
দ্বিতীয় ইনিংসে পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করেছেন তাইজুল। চতুর্থ দিনে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পাকিস্তানের অধিনায়ক শান মাসুদ ও বাবর আজমের মধ্যে ৯২ রানের জুটি ভাঙেন এই বাঁহাতি স্পিনার। ১১৬ বলে ৭১ রানের ইনিংস খেলে বাবর পাকিস্তানের জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখেন। এরপর মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সালমান আলী আগার ১৩৪ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটিও ভেঙে দেন তাইজুল। এই জুটিই মূলত ম্যাচকে পঞ্চম দিনে নিয়ে আসে। সালমানও খেলেন ৭১ রানের ইনিংস, আর বাবর করেন ৪৭ রান।
পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপের তিন মূল স্তম্ভকে ফেরানোর পর লেজের ব্যাটারদেরও দ্রুত গুটিয়ে দেন তিনি। সব মিলিয়ে ৩৪.২ ওভারে ৬ উইকেট নেন তাইজুল। তাইজুলের অবদান নিয়ে অধিনায়ক শান্ত বলেন, ‘তাইজুল ভাইকে নিয়ে আমি সবসময়ই একটু বেশি আশা করি। প্রথম টেস্টে ও খুব কম বল করেছে; অধিনায়ক হিসেবে সেটা আমার কাছেও একটু অস্বাভাবিক লেগেছে। তখন মিরাজ দারুণ বোলিং করেছিল। তবে এই টেস্টে যখন দায়িত্বটা পুরোপুরি তাইজুল ভাইয়ের কাঁধে এসেছে, তখন সে আবারও নিজের কাজটা ঠিকভাবে করেছে। আসলে এত বছর ধরেই ও দলকে এভাবেই সার্ভিস দিয়ে আসছে।’
কোনোভাবেই রিজওয়ান-সালমানের জুটি ভাঙতে পারছিল না বাংলাদেশ। তাসকিন-নাহিদ-শরিফুল-মিরাজ-তাইজুলরা চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ৮০ ওভার পর নতুন বল নেয় বাংলাদেশ। নতুন বলের দ্বিতীয় ওভারেই বোলিংয়ে আসেন তাইজুল, আর তাতেই আসে সাফল্য। সালমানকে ফিরিয়ে মুহূর্তেই ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে বাংলাদেশ। শেষ মুহূর্তে হাসান আলীকেও ফেরান এই স্পিনার।
নতুন বল তাইজুলের হাতে দেওয়ার প্রসঙ্গে শান্ত বলেন, ‘তাইজুল ভাই অতীতেও অনেকবার নতুন বলে বোলিং করেছে। তার যে স্কিল এবং যেভাবে তিনি বোলিং করেন, নতুন বলে সেটা সেট ব্যাটসম্যানদের জন্যও অনেক চ্যালেঞ্জিং হয়ে যায়। আমরা সেই সুযোগটাই কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, তাইজুল ভাই আবারও দলের জন্য ডেলিভার করতে পেরেছে।’
মঙ্গলবার নতুন বল নেওয়ার আগে ফিল্ডিং নিয়েও কনসার্ন ছিলেন শান্ত। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নতুন বল আসার আগে দেখবেন, আমি খুব ইন-আউট ফিল্ড প্লেসমেন্ট করেছিলাম। কারণ তখন বলের কন্ডিশন খুব একটা ভালো ছিল না, আর ওরাও ভালো ব্যাটিং করছিল। আমরা সেভাবে কোনো সহায়তা পাচ্ছিলাম না। তাই চেষ্টা ছিল এই সময়টায় যেন রান বেশি না হয়। আমরা জানতাম, নতুন বল এলে ব্যাটিং করা কঠিন হবে, কারণ আমাদের মানের স্পিনার ও পেসাররা নতুন বলে আবারও ওদের চাপে ফেলতে পারবে।’
শুধু বল হাতে নয়, ব্যাট হাতেও তাইজুলের বড় অবদান ছিল। প্রথম ইনিংসে লিটনের সঙ্গে ৪০ বল খেলে ১৬ রান করেন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে মুশফিকের সঙ্গে ৫১ বল খেলে ২২ রান করেন। টেলএন্ডার হিসেবে তাইজুল ছাড়াও নাহিদ রানা, শরিফুল ও তাসকিন দারুণ প্রভাব রাখেন।
অধিনায়ক শান্ত টেলএন্ডারদের ব্যাটিংয়ে মুগ্ধ, ‘আরেকটা বিষয় আমার কাছে আউটস্ট্যান্ডিং লেগেছে, লোয়ার অর্ডারের ব্যাটিং। একটা সময় এই জায়গায় আমরা অনেক বেশি ভুগেছি। কিন্তু এই সিরিজে তাইজুল ভাই, শরিফুল, তাসকিন ভাই, এমনকি রানা অবদান রেখেছে। প্রথম টেস্টে রানা এক ইনিংসে ২৭ বল খেলেছে, যা বড় উন্নতির ইঙ্গিত। আমি মনে করি, তাদের ব্যাটিং করার সামর্থ্য আছে। যদি তারা এই জায়গায় আরও পরিশ্রম করে, তাহলে দলকে ভবিষ্যতে আরও ভালো অবস্থানে নিতে পারবে।’