
X
টানা দুইবার টেস্টে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তাইজুল ইসলামের বলে উড়িয়ে মারতে গেলেন খুররম শাহজাদ। বাউন্ডারি লাইনে সহজ ক্যাচ মুঠোয় জমালেন তানজিদ হাসান তামিম। অপেক্ষার প্রহর পেরিয়ে উল্লাসে মাতল বাংলাদেশ। বুধবার সিলেট টেস্টের শেষ দিনে পাকিস্তানকে ৭৮ রানে হারিয়েছে স্বাগতিকরা। সিরিজ জিতল ২-০ ব্যবধানে। এই নিয়ে টানা দুইবার টেস্টে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ।
এদিকে, দেশের মাটিতে প্রথমবার পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জেতায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক।
অস্ট্রেলিয়ার পর বাংলাদেশ দ্বিতীয় কোনো টেস্ট দল যারা পাকিস্তানকে টানা দুইবার হোয়াইটওয়াশ করল। এর আগে ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়েছিলো নাজমুল হোসেন শান্তর দল। এক জায়গায় বাংলাদেশ একমাত্র। পাকিস্তানকে হোম ও অ্যাওয়েতে টেস্টে হোয়াইটওয়াশ করা একমাত্র দল বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে দ্বিতীয়বার কোন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে জিতল টানা চার টেস্ট। এর আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টানা চার টেস্ট জেতার নজির ছিলো। এই জয়ের ফলে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রে টেবিলের পাঁচে উঠে এলো বাংলাদেশ। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অনেক খালি বাকি থাকলেও আপাতত ইংল্যান্ড, ভারতের উপরে থাকার আনন্দ উপভোগ করতে পারবে লাল সবুজের প্রতিনিধিরা।
বড় জয়ের আভাস ছিল আগের দিন থেকেই। বৃষ্টিতে ১৫ মিনিট বিলম্বে শুরু হওয়া শেষ দিনের খেলায় বাংলাদেশের অপেক্ষা বাড়াচ্ছিলেন মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সাজিদ খান, বাড়ছিলো হতাশাও। প্রথম ঘন্টার বিরতির পর বদলে গেল সব। শরীরী ভাষায় বারুদ নিয়ে দ্রুতই মুড়ে দিল প্রতিপক্ষকে। ৪৩৭ রানের রেকর্ড তাড়ায় পাকিস্তান থামল ৩৫৮ রানে।
একটি উইকেট চাই, শুধু একটি উইকেট। বুধবার সকাল থেকেই ছিল কাতর অপেক্ষা। জুটি ভাঙার সেই উইকেটই ধরা দিচ্ছিল না। বাড়ছিল রান, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল শঙ্কা। যদিও মাত্র একটি ঘণ্টাই পেরিয়েছে, তবু মনে হচ্ছিল যেন অনন্তকাল! শেষ পর্যন্ত জুটি ভাঙার সেই উইকেট যখন ধরা দিল, বাকি দুটিও পড়ে গেল টপাটপ। যেন দীর্ঘ খরার পর প্রবল বর্ষণ!
বর্ষণই বটে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন ঝরছে সাফল্যের বাদলধারা। চলছে সেই বরিষায় আনন্দ অবগাহন। সিলেটও স্বাক্ষী রইল সেই গৌরবের। শেষ দিনে ৭৮ রানের জয়ে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করেই ছাড়ল নাজমুল হোসেন শান্তর দল। এই নিয়ে টানা দুটি টেস্ট সিরিজে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ।
২০২৪ সালে পাকিস্তানে গিয়েও ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। এবার দেশের মাঠে ধরা দিল একই সাফল্য। তবে এবারের কৃতিত্ব একটু আলাদাও।
সেবার দুটি টেস্টেই বাংলাদেশ টস জিতেছিল। এবার দুই টেস্টেই টস হেরে সবুজ উইকেটে আগে ব্যাট করতে হয়েছে। সব চ্যালেঞ্জ জিতেই ধরা দিয়েছে সিরিজ জয়ের স্বাদ।
জয়ের মঞ্চ সাজানো হয়ে গিয়েছিল আগের দিনই। শেষ দিনে পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ১২১ রান, বাংলাদেশের ৩ উইকেট। দিনের প্রথম ঘণ্টায় মোহাম্মাদ রিজওয়ান ও সাজিদ খান দ্রুত রান তুলে কিছুটা ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন বটে। তবে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত জিতেছে দাপটেই। এই জুটি ভাঙার পর আর কোনো রান ছাড়াই গুটিয়ে গেছে পাকিস্তানের ইনিংস।
আগের দিন ৪ উইকেট শিকারি তাইজুল ইসলাম শেষ দিনেরও নায়ক। বাংলাদেশের মাথাব্যথা হয়ে ওঠা জুটি ভেঙেছেন তিনি। তার হাত ধরেই এসেছে জয় নিশ্চিত করা উইকেট। দেশের সফলতম টেস্ট বোলারের প্রাপ্তি ইনিংসে ৬ উইকেট আর ম্যাচে ৯টি।
এ দিন সকাল থেকে সিলেটের আকাশ ছিল গোমড়া। থেমে থেমে ঝরছিল বৃষ্টি। তবে খেলায় বাগড়া খুব বেশি পড়েনি। ১৫ মিনিট দেরিতে শুরু হয় খেলা। নাহিদ রানার প্রথম ওভারেই আসে সুযোগ। গালিতে রিজওয়ানের ক্যাচ একটুর জন্য মুঠোয় জমাতে পারেননি মেহেদী হাসান মিরাজ।
এরপর থেকে কেবল যন্ত্রণাই বাড়ছিল। বেশ কয়েকবার অল্পের জন্য ব্যাটের কানায় লাগেনি বল। ক্যাচ পড়েছে দুই ফিল্ডারের মাঝে। দারুণ কিছু শটও খেলেছেন রিজওয়ান ও সাজিদ খান। ব্যবধান নেমে গেছে একশর নিচে। একটু পর আশির নিচে। বোলারদের কোনো প্রচেষ্টা, অধিনায়কের নানা কৌশল কাজে দিচ্ছিল না।
আশীর্বাদ হয়ে আসে তখন পানি পানের বিরতি। বিরতির পর দ্বিতীয় বলেই জুটি ভাঙেন তাইজুল। স্লিপে ধরা পড়েন সাজিদ (২৮)। জুটি থামে ৫৪ রানে।
পাকিস্তানের ইনিংসও থমকে যায় সেখানেই। শরিফুল আক্রমণে এসে প্রথম বলেই বিদায় করেন ৯৪ রান করা রিজওয়ানকে। শেষ উইকেটও দ্রুতই নিয়ে নেন তাইজুল।
১৩ বলের মধ্যে শূন্য রানেই পতন শেষ তিন উইকেটের। জয়ের পর বাংলাদেশ দল উল্লাস করল বটে। তবে খুব বাঁধনহারা আনন্দ দেখা গেল না। যেন তারা বোঝাতে চাইলেন, এ আর এমন কী!
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ২৭৮
পাকিস্তান প্রথম ইনিংস: ২৩২
বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস: ৩৯০
পাকিস্তান ২য় ইনিংস: ৯৭.২ ওভারে ৩৫৮ (লক্ষ্য ৪৩৭, আগের দিন ৩১৬/৭) (রিজওয়ান ৯৪, সাজিদ ২৮, খুররাম ০, আব্বাস ০*; তাসকিন ১২-১-৬২-০, শরিফুল ১২-৪-২৯-১, নাহিদ ১৮-৩-৭১-২, মিরাজ ২০-১-৬২-১, তাইজুল ৩৪.২-৪-১২০-৬, মুমিনুল ১-০-৩-০)
ফল: বাংলাদেশ ৭৮ রানে জয়ী।
সিরিজ: বাংলাদেশ ২-০ ব্যবধান জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: লিটন কুমার দাস।
ম্যান অব দা সিরিজ: মুশফিকুর রহিম।