পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা যখন পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে, ঠিক তখনই সামনে এসেছে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানার অন্ধকার অতীতের আরও অজানা অধ্যায়।
নিজের এলাকা নাটোরের সিংড়ার মহেশচন্দ্রপুর গ্রামে চুরির অপবাদ, পরকীয়া, লাখ লাখ টাকার জুয়ার ঋণ আর পারিবারিক কলহের জেরে তিন বছর আগেই গ্রামছাড়া হয়েছিলেন সোহেল। এরপর পরিচয় লুকিয়ে ঢাকায় এসে সোহেল কেড়ে নিল অবুঝ শিশু লামিয়ার জীবন।
গ্রাম থেকে ঢাকায় আসার যে কারণ
রামিসা ধর্ষণ ও হত্যায় মূল অভিযুক্ত সোহেল রানার আদিবাড়ি নাটোরের সিংড়া উপজেলার মহেশচন্দ্রপুর গ্রামে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাবা মো. জাকির আলীর তিন সন্তানের মধ্যে সবার বড় সোহেল এলাকায় একজন সাধারণ রিকশার মেকানিক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এ মেকানিক পরিচয়ের আড়ালেই তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল জুয়া, মাদক ও চুরির মতো অপরাধের দীর্ঘ তালিকা।
কাজের সূত্র ধরে গ্রামীণ শান্ত পরিবেশেই নিজের অপরাধের জাল বুনতে শুরু করেছিলেন সোহেল।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিয়মিত জুয়া খেলতে গিয়ে মাত্র কয়েক বছরেই প্রায় আট থেকে ১০ লাখ টাকার বিশাল ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন সোহেল।
ঋণের দায় এবং ক্রমাগত চুরির অপবাদে একপর্যায়ে তার বাবা অতিষ্ঠ হয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে বাধ্য হন। এরপর শুরু হয় সোহেলের অপরাধের এক নতুন অধ্যায়।
পরকীয়া প্রেম থেকে পরিবারে ভাঙন
সোহেল রানার ব্যক্তিগত জীবনও ছিল চরম কলঙ্কিত। গ্রামে প্রথম বিয়ে করার পর তার একটি পুত্রসন্তান জন্ম নেয়। তার বিরুদ্ধে নিজের ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনা জানাজানি হলে প্রথম স্ত্রী তাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যান।
সোহেলের ছোট বোন জলি বেগম জানান, এলাকায় থাকাকালে তার ভাই নানা অপকর্মে জড়িত ছিল। প্রায় তিন বছর আগে পরিবার থেকে বের করে দেওয়ার পর তার সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। মিডিয়ার মাধ্যমে তারা রামিসা হত্যার খবর পেয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, বাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর সিংড়ার বালুয়া বাসুয়া এলাকায় দ্বিতীয় বিয়ে করেন সোহেল। কিন্তু সেখানেও টিকতে পারেননি। ঋণের বোঝা আর কলঙ্কের হাত থেকে বাঁচতে প্রায় তিন বছর আগে এলাকা ছেড়ে ঢাকায় পালিয়ে যান সোহেল।
পরিচয় লুকালেও গোপন থাকেনি পাপ
ঢাকায় আসার পর নিজের আসল পরিচয় আড়াল করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন সোহেল। এমনকি নিজের বাবার নাম ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয় তৈরি করে পল্লবী এলাকায় বসবাস শুরু করেন।
তিন বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখে নিজেকে লুকিয়ে রাখলেও শিশু রামিসা হত্যার মধ্য দিয়ে তার সেই ভয়ানক অপরাধী রূপ দেশের মানুষের সামনে উন্মোচিত হলো।
সোহেলের এলাকায় নিন্দার ঝড়
সিংড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, থানার রেকর্ড অনুযায়ী সোহেল রানার বিরুদ্ধে অতীতে কোনো মামলা করা হয়নি।
গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি, গ্রামীণ সালিশ ও পারিবারিক লজ্জার কারণে অনেক অপরাধই পুলিশের খাতায় ওঠেনি। এসময় ঘাতক সোহেলের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান স্থানীয়রা।
নিজের এলাকার একজন অপরাধীর হাতে ঢাকার এক নিষ্পাপ শিশুর এমন নির্মম পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না মহেশচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দারা। গ্রামবাসীদের দাবি- শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার করতে হবে, খুনি সোহেল রানাকে ফাঁসি দিতে হবে।
প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার সকালে মিরপুরের পল্লবীর একটি ফ্ল্যাটে খাটের নিচ থেকে শিশু রামিসা আক্তারের মস্তকবিহীন দেহ এবং পরে বাথরুম থেকে খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হলে প্রধান আসামির স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে প্রথমে আটক করা হয়। পরে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।