
X
বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে গরু কেনা উচিৎ নয়
অনেক পরিবারের জন্য কোরবানির গরু কেনা শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, বরং বছরের সবচেয়ে আবেগঘন আয়োজনগুলোর একটি। তাই পছন্দের গরুটি দেখতে সুন্দর, বড়সড় আর হৃষ্টপুষ্ট হলেই অনেকে সেটিকেই ভালো গরু মনে করেন।
পশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে গরু কেনা বড় ভুল হতে পারে। কারণ প্রতি বছর কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দ্রুত গরু মোটা করতে স্টেরয়েড, হরমোন ও নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করেন। এতে গরু দেখতে অস্বাভাবিকভাবে মোটা ও চকচকে লাগলেও ভেতরে ভেতরে সেটি অসুস্থ হয়ে পড়ে।
ওষুধ দেয়া গরু চিনবেন যেভাবে
* হাঁটতে চায় না
* নড়াচড়া কম করে
* ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে
* অতিরিক্ত ক্লান্ত দেখায়
* শরীরের উজ্জ্বলতা কম থাকে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত ওজনের কারণে ওষুধ দেয়া গরু সহজে চলাফেরা করতে পারে না।
কেন ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়?
কোরবানির হাটে বড় ও মোটা গরুর চাহিদা বেশি। এই সুযোগে কিছু ব্যবসায়ী স্বল্প সময়ে গরু ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলতে নানা ধরনের স্টেরয়েড বা ওষুধ ব্যবহার করেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল হাশেমের মতে, এসব ওষুধে গরুর শরীরে অতিরিক্ত পানি জমে যায়। ফলে গরুকে দেখতে ভারী ও মোটাসোটা মনে হয়।
কিন্তু বাস্তবে—
* কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়
* যকৃত ও পাকস্থলী দুর্বল হয়ে পড়ে
* ফুসফুসে সমস্যা দেখা দেয়
* শরীর ভেতর থেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে
কিভাবে বুঝবেন গরুটি সুস্থ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ গরু চিনতে হলে শুধু শরীরের আকার নয়, গরুর আচরণ, চলাফেরা, চোখ-মুখ, শ্বাস-প্রশ্বাস—সবকিছু খেয়াল করতে হবে।
১. শরীর অস্বাভাবিক ফুলে আছে কি না দেখুন
স্টেরয়েড বা রাসায়নিক দেয়া গরুর শরীর অনেক সময় ফুলে থাকে। বিশেষ করে রান, ঘাড় বা পেট অস্বাভাবিকভাবে স্ফীত দেখায়।
এ ধরনের গরুর শরীরে হাত দিয়ে চাপ দিলে কিছু সময়ের জন্য গর্তের মতো বসে যেতে পারে। কারণ শরীরে পানি জমে থাকে।
২. গরু হাঁটছে নাকি শুধু দাঁড়িয়ে আছে?
সুস্থ গরু সাধারণত চটপটে হয়। আশপাশের শব্দে কান নাড়ায়, লেজ ঝাঁকায়, হাঁটাচলা করে।
৩. নাক শুকনো নাকি ভেজা?
পশু বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ গরুর নাকের ওপরের অংশ সাধারণত ভেজা বা ঘামযুক্ত থাকে।
অন্যদিকে অসুস্থ গরুর নাক অনেক সময় শুকনো থাকে।
৪. মুখে লালা ঝরছে কি না
অতিরিক্ত স্টেরয়েড দেয়া গরুর মুখ দিয়ে অনেক সময় অনবরত লালা ঝরতে থাকে।
৫. শ্বাস-প্রশ্বাস লক্ষ্য করুন
রাসায়নিক দেয়া গরুর শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হতে পারে। দূর থেকে দেখলেও মনে হবে যেন হাঁপাচ্ছে।
কারণ শরীরের ভেতরের অঙ্গগুলো দুর্বল হয়ে পড়লে গরুর স্বাভাবিক শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
৬. শরীরের রঙ ও চামড়া খেয়াল করুন
সুস্থ গরুর শরীর উজ্জ্বল দেখায়। চামড়া টানটান থাকে। পিঠের কুজ শক্ত ও দাগমুক্ত থাকে।
৭. পায়ের মাংস শক্ত নাকি থলথলে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ গরুর রানের মাংস শক্ত ও দৃঢ় হয়।
কিন্তু রাসায়নিক দেয়া গরুর পা বা রান নরম ও থলথলে লাগতে পারে।
৮. শরীর অতিরিক্ত গরম কি না বুঝুন
গরুর শরীরে হাত দিয়ে যদি অস্বাভাবিক গরম মনে হয়, তাহলে সতর্ক হতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ গরুর দেহের তাপমাত্রা ১০২ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট হয়। খুড়া রোগে আক্রান্ত গরুর শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়।
খুড়া রোগের লক্ষণ হলো খুঁড়িয়ে হাঁটা, মুখ বা ক্ষুরে ঘা, খাবার না খাওয়া, শরীর গরম থাকা।
রোগা গরুর যত লক্ষণ
* কৃমিতে আক্রান্ত গরু বেশ বিবর্ণ ও হাড় জিরজিরে হয়
* খুড়া রোগাক্রান্ত গরুর ক্ষুর ও মুখে ঘা থাকতে পারে
* পিঠের কুজ মোটা, টানটান ও দাগমুক্ত নয়
* তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি
* মুখ, জিহ্বা, শরীর, পা, ক্ষুর, গোড়ালিতে কোন ক্ষত থাকা
এছাড়া খাবারে অনীহা, জাবর না কাটা, মুখ শুকনো থাকা—এসবও অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে। সুস্থ গরুর সামনে খাবার ধরলে সেটি আগ্রহ নিয়ে খেতে চাইবে।