
X
সংগৃহীত ছবি
ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের অলিগলি, পাড়া-মহল্লা, ছাদ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়ে যায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার চিরচেনা তর্ক। জাতীয় দলের ড্রেসিংরুমও এর বাইরে নয়। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন একটি পরিবার আছে, যেখানে বিশ্বকাপ এলে সমর্থনের প্রশ্নে কোনো বিভক্তি নেই। প্রায় পুরো পরিবারই এক পতাকার নিচে দাঁড়ায়। তারা প্রত্যেকেই ব্রাজিলের কট্টর সমর্থক।
জন্মের পরই যেন ‘ব্রাজিলের ভিসা’
বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল খান ব্রাজিলের সমর্থক, তেমনি তার বড় ভাই নাফিস ইকবাল খানও। শুধু দুই ভাই নন, পুরো খান পরিবারেই যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে ব্রাজিল সমর্থনের উত্তরাধিকার। নাফিস ইকবালের ভাষায়, ব্রাজিল সমর্থন যেন তাদের পারিবারিক পরিচয়েরই অংশ, ‘আমি ব্রাজিলের সমর্থক।
আমরা যে পরিবার থেকে এসেছি, সেখানে জন্মের পরই যেন ‘ব্রাজিলের ভিসা’ দিয়ে দেওয়া হয় (হাসি)! পুরো পরিবারই ব্রাজিল সমর্থন করে। আমার মনে হয় ৬০-৭০ জনের বড় পরিবারে মাত্র দুই-তিনজন আর্জেন্টিনার সমর্থক আছে। বাকিরা সবাই ব্রাজিলের। তাই অন্য কোনো দল সমর্থনের সুযোগই ছিল না। আমরা পরিবারগতভাবে সেই ঐতিহ্যই অনুসরণ করি।’
নতুন প্রজন্মও ফুটবলে মজেছে
ব্রাজিল-প্রেম এখন শুধু নাফিস-তামিমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নতুন প্রজন্মও ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। নাফিস জানালেন সেই কথা, ‘আমার ছেলে ফুটবলের বড় ভক্ত। সে ব্রাজিলের সমর্থক, তবে পর্তুগালেরও সমর্থন করে। তামিমের ছেলের ক্ষেত্রেও একই বিষয়। আর আমার মেয়ে ফুটবল খুব ভালো খেলে। সে স্কুল দলের খেলোয়াড়। এমনকি বসুন্ধরাতেও নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেয়। তাই বলা যায়, আমাদের নতুন প্রজন্মও ফুটবলের সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই জড়িয়ে আছে।’
চট্টগ্রামের সেই পতাকার গল্প
বিশ্বকাপের সময় খান পরিবারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ির বাড়ি। সেখানে বিশ্বকাপ এলেই শুরু হয়ে যেত উৎসব। বিশেষ করে নাফিসের ছোট চাচা আকবর খান ছিলেন পুরো আয়োজনের প্রাণ। পুরোনো সেই স্মৃতি বলতে গিয়ে কিছুটা আবেগাপ্লুত হলেন নাফিস, ‘আগে চট্টগ্রামে বিশ্বকাপ এলেই বিশাল একটা আমেজ তৈরি হতো। বিশেষ করে আমার ছোট চাচা আকবর চাচা ছিলেন সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন।’
এরপর নাফিস বলেন, ‘তার (আকবর চাচার) সবসময় লক্ষ্য থাকত, পুরো এলাকায় সবচেয়ে বড় ব্রাজিলের পতাকাটা আমাদের বিল্ডিংয়েই থাকতে হবে। অনেক সময় দেখা যেত, অন্য কেউ বড় পতাকা লাগিয়ে দিয়েছে, তখন আবার আরও বড় পতাকা বানানো হতো। এক পর্যায়ে পুরো বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে নিচ পর্যন্ত বিশাল ব্রাজিলের পতাকা ঝুলিয়েছিলেন।’
এক ফ্ল্যাটে জড়ো হয়ে খেলা দেখা
চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ির বাড়িতে বিশ্বকাপ মানেই ছিল খান পরিবারের মিলনমেলা। নাফিস বলেন, ‘আমাদের ছিল ফ্ল্যাট সিস্টেম। চাচাদের আলাদা আলাদা ফ্ল্যাট ছিল, কিন্তু ব্রাজিলের খেলা হোক বা অন্য কোনো বড় ম্যাচ—সবাই এক ফ্ল্যাটে জড়ো হয়ে খেলা দেখতাম। চাচা মারা যাওয়ার পর থেকে সেই আয়োজন অনেকটাই কমে গেছে। এখন অনেক চাচা আর কাজীর দেউড়ির সেই বাসায় থাকেন না। কেউ ঢাকায় চলে এসেছেন, তামিমও এখন ঢাকায়। তাই আগের মতো নিয়মিত একসঙ্গে হওয়া হয় না।’
ফেসবুকে আনফ্রেন্ড পর্যন্ত!
ফুটবল নিয়ে আবেগের গল্পও আছে নাফিসের। তবে তরুণ বয়সে আবেগের বশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মজার কিছু ঘটনাও ঘটিয়েছেন তিনি, ‘সামনাসামনি বড় কোনো ঝগড়া হয়নি। তবে ছোটবেলায় বা তরুণ বয়সে ফেসবুকে অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। এমনও হয়েছে, ফুটবল নিয়ে তর্ক করতে গিয়ে বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়দের আনফ্রেন্ড করে দিয়েছি। তবে সেগুলো কখনোই খুব সিরিয়াস পর্যায়ে যায়নি। আবেগী হয়েছিলাম, কিন্তু সেটা মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ ছিল।’
ড্রেসিংরুমেও বিশ্বকাপের উত্তাপ
বিশ্বকাপের উত্তেজনা শুধু পরিবারের মধ্যে নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের ড্রেসিংরুমেও ছড়িয়ে পড়ে। নাফিস জানালেন, বড় টুর্নামেন্টের সময় ক্রিকেটারদের মধ্যেও চলে খুনসুটি আর মজার লড়াই। গত বিশ্বকাপের স্মৃতি টেনে নাফিস বলেন, ‘অনেক মজা হয়। গত বিশ্বকাপের সময় আমরা চট্টগ্রামের রেডিসন হোটেলে ছিলাম। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো দেখার জন্য সুন্দর ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
সবাই একসঙ্গে খেলা দেখেছি।’
নাফিসের দাবি, বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশেই তারা খেলা উপভোগ করেন, ‘আমাদের মধ্যে খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ থাকে। আর্জেন্টিনা যদি গোল খায় বা খারাপ খেলতে থাকে, তখন ব্রাজিল সমর্থকরা মজা করে। আবার ব্রাজিল খারাপ খেললে আর্জেন্টিনা সমর্থকরা জেগে ওঠে। এই সংস্কৃতিটা দলের মধ্যে সুন্দর একটা বন্ধনও তৈরি করে।’
সীমার মধ্যে খুনসুটি
ড্রেসিংরুমে ফুটবল নিয়ে মজা হলেও সেটি কখনো বাড়াবাড়ির পর্যায়ে যায় না। ড্রেসিংরুমে সবচেয়ে আবেগী সমর্থক কে—এমন প্রশ্নে অবশ্য কাউকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে চাননি নাফিস, ‘আমার মনে হয় আমাদের ড্রেসিংরুমে কেউই অতটা আবেগপ্রবণ না। কারণ আমরা সবাই জানি, আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার ক্রিকেট। সবাই বোঝে কতটা মজা করা যায় আর কোথায় সীমা টানতে হয়, যাতে কাউকে কষ্ট না দেওয়া হয়। হাসি-ঠাট্টা, খোঁচাখুঁচি অবশ্যই হয়, কিন্তু সবকিছু একটা সীমার মধ্যেই থাকে।’
জাতীয় ক্রিকেট দলে সেরা ফুটবলার কে?
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অনুশীলনের বড় একটি অংশই ফুটবল। ওয়ার্ম-আপে নিয়মিত ফুটবল খেলেন ক্রিকেটাররা। সেই হিসেবে দলের সেরা ফুটবলারের নামও বলে দিয়েছেন নাফিস, ‘এই মুহূর্তে মুশফিকুর রহিম। এছাড়া লিটন দাস ও শান্তও খুব ভালো ফুটবল খেলে।’
সুপার ওভার নাকি পেনাল্টি শুটআউট?
ক্রিকেটের সুপার ওভারে যেমন প্রবল চাপ থাকে, তেমনি ফুটবলে পেনাল্টি শুটআউটেও একই অবস্থা হয় দর্শকদের। নাফিসের কাছে অবশ্য পেনাল্টি শুটআউটই বেশি চাপের, ‘দর্শক হিসেবে চিন্তা করলে আমার কাছে পেনাল্টি শুটআউটই বেশি চাপের মনে হয়।’
আক্ষেপের অপেক্ষা শেষ হবে?
ব্রাজিল সর্বশেষ বিশ্বকাপ জিতেছে ২০০২ সালে। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সমর্থকদের মতো ইকবাল পরিবারও সেই অপেক্ষার অংশ। তবু সমর্থন বদলায়নি। পতাকার রং বদলায়নি। প্রজন্ম বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে, একসঙ্গে খেলা দেখার জায়গা বদলেছে—কিন্তু ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসা একই রয়ে গেছে খান পরিবারের।
নাফিসের বিশ্বাস, এবার তাদের দল বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার, ‘অনেক বছর হলো ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিততে পারছে না। এ নিয়ে খোঁচাও কম শুনতে হচ্ছে না। এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আশা করি এবার আমাদের সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে ব্রাজিল।’