
X
সংগৃহীত ছবি
ম্যাচের আগে সতীর্থের মায়ের মৃত্যুতে ড্রেসিংরুমে নেমে এসেছিল শোকের ছায়া। সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেই নেপালের বিপক্ষে সেমিফাইনালের কঠিন লড়াইয়ে মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশের মেয়েরা। শুরুতে পিছিয়ে পড়েও দারুণ প্রত্যাবর্তনে জয় ছিনিয়ে এনেছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।
ম্যাচ শেষে এই জয়কে সদ্য মাতৃহারা সতীর্থ শিউলি আজিম ও পুরো দেশবাসীর প্রতি উৎসর্গ করেছেন দলের অন্যতম কাণ্ডারি ঋতুপর্ণা চাকমা।
বুধবার গোয়ার পন্ডিত জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে শ্বাসরুদ্ধকর সেমিফাইনাল শেষে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন দলের এই লেফট উইঙ্গার। কর্নার থেকে সরাসরি দর্শনীয় এক অলিম্পিক গোল করে দলকে সমতায় ফেরানো ঋতুপর্ণার কণ্ঠে তখনো আবেগ আর স্বস্তির মিশেল।
নেপালের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে শোকাহত দলের মানসিক অবস্থা তুলে ধরে ঋতুপর্ণা বলেন, “আসলে ম্যাচটা অনেক কঠিন ছিল। আমাদের লক্ষ্য ছিল ফাইনালে যাওয়ার, আর এই ম্যাচটা ছিল আমাদের জন্য ‘ডু অর ডাই’।
বিশেষ করে আমাদের টিমমেট শিউলি দিদির মায়ের জন্য হলেও, দেশবাসীর জন্য হলেও আমাদেরকে আজ এই ম্যাচটা বের করে আনতে হতো। আমরা সেটা করতে পেরেছি।”
দলের সবার নিবেদনের প্রশংসা করে তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমাদের প্লেয়াররা সবাই যারা খেলেছে এবং যারা বদলি ছিল তারাও নেমে ১২০ শতাংশ দিয়ে খেলেছে।’
প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে কর্নার থেকে সরাসরি বাঁকানো শটে নেপালের জালে বল জড়ান ঋতুপর্ণা। এমন জাদুকরী গোলের অনুভূতি জানতে চাইলে কিছুটা লাজুক হেসেই তিনি বলেন, ‘এটা আমার কাছে মনে হয় আনবিলিভেবল! খুবই ভালো লাগছে।’
নেপালের বিপক্ষে নিয়মিত গোল করার বিষয়ে তাকে ‘নেপাল কিলার’ বলা হলে তিনি বিনয়ের সঙ্গেই তা এড়িয়ে যান। ম্যাচের ২৩ মিনিটে গোল হজম করে পিছিয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ। এমন চাপের মুহূর্তে দলের মানসিকতা কেমন ছিল এমন প্রশ্নের জবাবে এই অভিজ্ঞ ফুটবলারের কণ্ঠে ঝরে পড়েছে আত্মবিশ্বাস, ‘খেলার মধ্যে তো ভয় থাকেই। কিন্তু ভয় বলতে কোনো কিছু না, আমরা জানি যে আমরা পারি এবং আমরা সেটাই করে দেখিয়েছি।’
গ্রুপ পর্বে ভারতের কাছে হোঁচট খাওয়ার পর সেমিফাইনালে এমন দারুণ কামব্যাক দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। সামনেই শিরোপা নির্ধারণী ফাইনাল, যেখানে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ভারত। তবে আপাতত কোনো বাড়তি চাপ নিচ্ছেন না বলে সাফ জানিয়ে দিলেন ঋতুপর্ণা।
ফাইনালের পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘চাপ বলতে, আমরা এখন কোনো চাপ নিচ্ছি না। আমাদের এখনো সময় আছে, আমরা দুদিন সময় পেয়েছি। আমাদের কোচ, কোচিং স্টাফরা যারা আছেন; তাদের প্ল্যান অনুযায়ী আমরা মাঠে নামব।’
শিউলির ব্যক্তিগত বেদনা সামলে মাঠে নামার বিষয়ে অধিনায়ক মারিয়া বলেন, ‘শিউলি যে কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, আমরাও ঠিক একই কষ্ট অনুভব করছিলাম। তবে আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে নিয়েছিলাম যে, এটাই আমাদের শেষ সুযোগ। এই সুযোগ যদি আমরা কাজে লাগাতে পারি, তবেই ফাইনালে যেতে পারব।’
বাংলাদেশ দল এই জয় উৎসর্গ করেছে শিউলির প্রয়াত মায়ের উদ্দেশ্যে।
এদিনও নিজের চেনা ফর্মে না থাকলেও এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সমতা ফিরিয়ে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন তারকা ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমা। কর্নার কিক থেকে সরাসরি করা অলিম্পিক গোলের সুবাদে ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তার হাতে।
টিম বাসে ওঠার সময় ঋতুপর্ণা বলেন, ‘এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমি কীভাবে গোলটা করে ফেললাম, তা আমি নিজেও জানি না। আমার মনে হয়, এটা সৃষ্টিকর্তার উপহার ছিল। প্রতিটি গোলই স্পেশাল, তবে আজকের গোলটি আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।’