
X
শিশু রামিসা প্রতীকী ছবি
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে (৮) ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় করা মামলার রায় ঘোষণা করেছেন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়।
রোববার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।
গত ১৯ মে ঢাকার পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির স্কুলছাত্রী ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে প্রতিবেশী সোহেল রানা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করেন। এ ঘটনায় ২০ মে পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন রামিসার বাবা।
কী ঘটেছিল সেদিন
সোহেলের জবানবন্দির বরাতে আদালত সূত্রে জানা গেছে, ওই দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। এরপর বাথরুমে নিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করে সোহেল। এতে জ্ঞান হারায় ছোট্ট রামিসা।
শিশুটির মা সোহেলের বাসার দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। এ সময় সোহেল তাকে গলা কেটে হত্যা করে। পরে মরদেহ গুম করার জন্য তার মাথা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করে। দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখে। এ ছাড়া ছুরি দিয়ে যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করে। ঘটনার সময় তার স্ত্রী একই রুমে ছিল। একপর্যায়ে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল।
ঘটনার আগে ইয়াবা সেবন করেছিল বলে স্বীকার করেন সোহেল। ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে পূর্ব কোনো শত্রুতা ছিল না বলে জানান তিনি।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, হত্যার শিকার শিশু রামিসা রাজধানীর একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে বাসা থেকে বের হয়। সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার কৌশলে তাকে নিজেদের ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য শিশুটিকে পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি করেন।
এক পর্যায়ে অভিযুক্তদের ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তারা। পরে অনেক ডাকাডাকিতেও কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন শিশুটির স্বজন ও প্রতিবেশীরা।
ওই সময় ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে শিশুটির মাথাবিহীন মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন তারা। এ ছাড়া আরেকটি কক্ষের ভেতরে একটি বালতির মধ্যে তার মাথাটি রাখা ছিল।
মামলার আবেদনে আরও বলা হয়, মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিশু রামিসার মাথা শরীর থেকে আলাদা করা হয়।
সেই সঙ্গে তার সংবেদনশীল অঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করা হয় এবং দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখা হয়। পরে খণ্ডিত মাথাটি বালতির মধ্যে রাখা হয়।
অন্যদিকে ঘটনার পর কক্ষের জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল রানা। প্রথমে স্বপ্নাকে আটক করে পুলিশ। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহলেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এই ঘটনায় ২০ মে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। গ্রেপ্তারের পর প্রধান আসামি সোহেল রানা আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।
হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষে মাত্র ৫ দিনের মাথায় রোববার (২৪ মে) পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন।
এরপর গত ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ওই দিন আদালতে সোহেল রানা দাবি করেন, ডলার নামের একজন শিশুটিকে ধর্ষণ করেছেন। ডলারের পরিচয় জানতে চাইলে সোহেল রানা বলেন, তার বাড়ি মিরপুরে। তিনি অনেক টাকাওয়ালা।
নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সোহেল রানা আদালতকে বলেন, ‘আমি মারিনি। আমি ধর্ষণও করিনি। আমার স্ত্রীও নির্দোষ।’
পরদিন ২ জুন আদালতে আসামি সোহেল রানা বলেন, ‘আমার সঙ্গে যে ছিল ওর নাম ডলার, তারে আপনারা ধরেন। আমি দোষ করি নাই তা না, আমিও দোষ করেছি, ডলারও দোষ করেছে...।’
তবে আসামিপক্ষে সরকার নিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্লাহ বলেন, আসামিরা তার কাছে ডলার সম্পর্কে কিছুই বলেনি। পুলিশ রিপোর্টে ডলারের নাম নেই বলেও জানান তিনি।
এ মামলায় রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষ হয় বৃহস্পতিবার (৪ জুন)। যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রোববার (৭ জুন) রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।
১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আজ সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। শিশুটি ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় গত ১৯ মে। সে হিসেবে ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় আজ রায় ঘোষণা হলো।