হতাশা থাকলেও হাল ছাড়েননি মোসাদ্দেক

ক্রীড়া প্রতিবেদক

খেলাধুলা

আক্ষেপ, হতাশা, লড়াই, এই শব্দগুলিই গত কয়েক বছরে ছিল মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের নিত্য সঙ্গী। ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে

2026-06-10T21:08:26+00:00
2026-06-10T21:08:26+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
হতাশা থাকলেও হাল ছাড়েননি মোসাদ্দেক
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ৯:০৮ পিএম   (ভিজিট : ৩২)
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে ম্যাচসেরা হয়েছেন বাংলাদেশের মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত-ইন্টারনেট
X

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে ম্যাচসেরা হয়েছেন বাংলাদেশের মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত-ইন্টারনেট

আক্ষেপ, হতাশা, লড়াই, এই শব্দগুলিই গত কয়েক বছরে ছিল মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের নিত্য সঙ্গী। ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে (ডিপিএল) মৌসুমের পর মৌসুম অসাধারণ পারফর্ম করেও জাতীয় দলের দুয়ার খোলা পাননি। কখনও কখনও মুষড়ে পড়েছেন। তবে নুইয়ে পড়েননি। নতুন করে লড়াইয়ে নেমেছেন। মনের কোণে আশার প্রদীপ যে জ্বলছিল! জাতীয় দলের ফেরার দিনটিতে দুর্দান্ত অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে দলকে জিতিয়ে এই অলরাউন্ডার শোনালেন সেই সময়ের গল্প।

প্রায় চার বছর পর ওয়ানডে দলে ফিরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ৭০ বলে ৮৬ রানের অপরাজিত ইনিংস উপহার দেন মোসাদ্দেক। পরে দুটি উইকেট ও দুর্দান্ত একটি ক্যাচ নিয়ে তিনিই জেতেন ম্যান অব দা ম্যাচের পুরস্কার।

আর এই ম্যাচের আগে সবশেষ ওয়ানডে খেলেন তিনি ২০২২ সালের অগাস্টে। ওই বছরের নভেম্বরে টি২০ বিশ্বকাপের পর জাতীয় দল থেকে ছিটকে পড়েন, সেই দূরত্ব আর ঘোচাতে পারছিলেন না। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ও বিপিএলে তার পারফরম্যান্স উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। কিন্তু একদিনের ম্যাচের সংস্করণে ঘরোয়া ক্রিকেটে দেশের মূল প্রতিযোগিতা ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে মৌসুমের পর মৌসুম তার পারফরম্যান্স ছিল অবিশ্বাস্য।

সংখ্যাগুলোর দিকে তাকালে চোখ কপালে উঠতে পারে অনেকের। ২০২২-২৩ মৌসুমে ৪৭ গড় ও ৯৬.৬২ স্ট্রাইক রেটে ৬৫৮ রান। ওভারপ্রতি ৪.৫৩ রান দিয়ে ১৬ উইকেট। ২০২৩-২৪ মৌসুমে ৭৯.২০ গড় ও ১২৩.৭৫ স্ট্রাইক রেটে ৩৯৬ রান। ওভারপ্রতি ৩.৮৪ রান দিয়ে ২০ উইকেট। ২০২৪-২৫ মৌসুমে ৪৮.৭০ গড় ও ১০৬.৩৩ স্ট্রাইক রেটে ৪৮৭ রান। ওভারপ্রতি ৪.০৪ রান দিয়ে ৩০ উইকেট।

এবার দলে ডাক পাওয়ার আগ পর্যন্ত ৭৭.৫০ গড়ে ও ১২৯.১৬ স্ট্রাইক রেটে ৩১০ রান। ওভারপ্রতি ৩.৭৪ রান দিয়ে ১২ উইকেট। সঙ্গে ছিল দুর্দান্ত নেতৃত্বও। বিশেষ করে, গত মৌসুমে কঠিন বাস্তবতার মধ্যে যেভাবে তার নেতৃত্বে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আবাহনী লিমিটেড, সেটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে ঘরোয়া ক্রিকেটের ইতিহাসে।

এমন অতিমানবীয় অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের পরও জাতীয় দলের ডাক না এলে তাড়না মরে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। মোসাদ্দেকও নিজের সঙ্গে লড়েছেন। যখনই হতাশা গ্রাস করেছে, তখনই আবার নিজেকে জাগিয়ে তুলেছেন সুদিন ফেরার আশায়। তিনি বলেন,‘ হতাশা ছিল। খুব সহজ সময় ছিল না আমার জন্য। আমার লড়াইয়ের সময়টা হয়তো অনেকেই আপনারা দেখেছেন, হয়তো অনেকে দেখেননি। ওই জায়গা থেকে আমি সবসময় ধৈর্য ধরার চেষ্টা করেছি এবং নিজের কাজগুলো করার চেষ্টা করেছি। এটা মাথার মধ্যে ছিল যে, একটা সুযোগ যখন আসবে, সেই সুযোগ যেন ভালোভাবে নিতে পারি। গত কয়েক বছর ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটে যেভাবে খেলছিলাম, এই বিশ্বাসটা ছিল যে এটা চালিয়ে যেতে পারলে একটা না একটা সময়ে আমার সুযোগ আসবে। যতটুকু না চেয়েছি, আল্লাহ তার থেকে অনেক বেশি দিয়েছেন।’

একসময় সীমিত ওভারের ক্রিকেটে নিয়মিত মুখই ছিলেন বাংলাদেশ দলে। সেই সময়টা অতীত হয়ে গেছে অনেক আগেই। অনেক লড়াই আর অপেক্ষার পর অবশেষে কাঙ্ক্ষিত সময়ের দেখা পেয়েছেন। জাতীয় দল থেকে দূরে থাকার দীর্ঘ এই প্রহরে অনুভূতিগুলোয় মরচে পড়ে গিয়েছিল। 

তবে ফেরার পর সতীর্থদের ভালোবাসায় দূর সরে গেছে সব অস্বস্তি। তিনি বলেন,‘ আমি কৃতজ্ঞ টিম ম্যানেজমেন্টের প্রতি। উনারা যেভাবে আমার পাশে থেকেছেন, খেলার শুরুর আগে যেভাবে স্বাধীনতা আমাকে দিয়েছেন, আমাকে স্রেফ বলা হয়েছে আমার খেলাটাকে উপভোগ করতে। ওই জিনিসটা খেলার সময় মাথার মধ্যে ছিল না যে অনেকদিন পরে এসেছি বা কিছু। পরিস্থিতি যা দাবি করছিল, আমার কাছে মনে হয়েছে যে, ওভাবে করেই যাওয়া উচিত। আমি স্রেফ আমার কাজটা করার চেষ্টা করেছি। অধিনায়ক থেকে শুরু করে সবাই সাপোর্ট করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে যেহেতু আমি এতদিন পরে এসেছি, ওরা সবাই মিলে চাইছে যেন আমি ওই অনুভূতি না পাই যে এতদিন পরে এসেছি। আবারও পুরো দলের প্রতি কৃতজ্ঞ।’

দলে সুযোগ পাওয়া কেবল ছিল মোসাদ্দেকের একটি জয়। তবে মূল পরীক্ষা তো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। পারফর্ম করার চ্যালেঞ্জ তো আছেই, সঙ্গে আছে পাহাড় সমান চাপও। জাতীয় দলে ফিরে যদি পারফর্ম করতে না পারেন, তাহলে স্রেফ ‘ঘরোয়া ক্রিকেটের বাঘ’ তকমা নিয়েই হয়তো শেষ করতে হতো ক্যারিয়ার।

আর সেই ম্যাচে যখন তিনি ক্রিজে গেলেন, ১৪০ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে দল তখন বেশ বিপদে। সেখান থেকেই আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে আর উদ্ভাবনী নানা শটে দলকে নিয়ে গেছেন এমন স্কোরে, যেখান থেকে দল পেয়েছে ৮৬ রানের জয়।
 
***পেছনের প্রেক্ষাপট আর ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় এই পারফরম্যান্সকে নিজের ক্যারিয়ারের সেরা বললেন ৩০ বছর বয়সি এই অলরাউন্ডার,‘ বলা যায় এরকম চাপের মুহূর্তে সেরা ম্যাচ। যদি আপনারা উইকেট সকাল থেকেই দেখেন, আমরা ড্রেসিং রুমেও কথা বলছিলাম, ৩০০-৩২০ রানের উইকেট ছিল। খুবই ভালো উইকেট। যখন আমাদের (পরপর) দুইটা উইকেট পড়ে যায়, আমাদের জন্য একটু কঠিন হয়ে যায়। লিটনের আউটটা যদি ওই সময়টাতে না হতো, হয়তোবা আমরা ৩০০-৩২০ করতে পারতাম।’

বাংলাদেশের ক্রিকেটে মোসাদ্দেক হোসেনের পরিচয় হয়ে গিয়েছিল ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ক্রিকেটার। মৌসুমের পর মৌসুম অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স করেছেন এই টুর্নামেন্টে। সেই সাফল্য তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও বয়ে আনবেন, এমন বিশ্বাস করা লোকের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। জাতীয় দলে ফেরার ম্যাচটি দারুণ পারফরম্যান্সে রাঙিয়ে এই অলরাউন্ডার কৃতজ্ঞতা জানালেন সেই ঢাকা লিগের প্রতিই।

প্রায় চার বছর পর জাতীয় দলে ফিরেই ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস খেলেন মোসাদ্দেক। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৭০ বলে ৮৬ রানের ইনিংস খেলেই শেষ হয়নি তার ভূমিকা। পরে বল হাতে ৩৭ রানে নেন দুই উইকেট। ম্যাচ-সেরার স্বীকৃতিও পান।

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ ছাড়া ঘরোয়া অন্যান্য প্রতিযোগিতায় খুব একটা উজ্জ্বল ছিলেন না তিনি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট গত কয়েক মৌসুমে খেলেছেন খুবই কম। বিপিএলেও নেই উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্স। সবশেষ বিপিএলে নিলাম থেকে তাকে দলে নেয়নি কোনো ফ্রাঞ্চাইজি। সেসময় খেলছিলেন তিনি ময়মনসিংহের প্রিমিয়ার লিগে!

কিন্ত ঢাকা লিগে ছিল তার ভিন্ন চেহারা। গত তিন মৌসুমে এক হাজার ২৭৮ রান করার পাশাপাশি ৫৮ উইকেট শিকার করেছেন। এবারের চলমান আসরে ৭ ইনিংসে ৬৭.২০ গড়ে ৩৩৬ রান করেছেন ও বল হাতে নিয়েছেন ২০.৩৩ গড়ে ১২ উইকেট। ওভারপ্রতি খরচ করেছেন ৪.১২ রান।

আর এমন পারফরম্যান্সের পর এবার আর তাকে উপেক্ষা করতে পারেননি নির্বাচকরা। তিনিও প্রতিদান দিলেন সেই আস্থার। এরপর দলকে জিতিয়ে বললেন,‘ অবশ্যই উজ্জীবিত করেছে (লিগের পারফরম্যান্স। পারফর্ম করতে থাকলে ওই বিশ্বাসটা মাথার মধ্যে সবসময় কাজ করে যে, একটা সুযোগ আসতে পারে। আবাহনীতে খেলি আর ঘরোয়া যেখানেই খেলি না কেন, দিনশেষে সবাই চেষ্টা করে দেশকে সার্ভ করার জন্য। এটাই ছিল মূল লক্ষ্য এবং আমি বিশ্বাস করি যে, সবাই এই জিনিসটা বিশ্বাস করে। ওই জায়গা থেকে অবশ্যই বলব যে, প্রিমিয়ার লিগের পারফরম্যান্স থেকে শুরু করে সবকিছুর একটা মূল্য আছে।”

ঘরোয়া ক্রিকেটে যে আগ্রাসী ব্যাটিং দেখা যায় তার, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার ম্যাচেও দেখা গেছে তার সেই ধরনের ব্যাটিং। দলের চাপের মধ্যেও তিনি সহজাত শট খেলে গেছেন। সেখানেও তিনি কৃতিত্ব দিলেন ঢাকা লিগকেই। ঘরোয়া ক্রিকেটে আমি এভাবেই খেলার চেষ্টা করছিলাম। এখনকার ক্রিকেট যদি আমরা দেখি, সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি বা স্ট্রাইক রেটের কথা যদি আসে, ঐ জিনিসটা সবসময় মাথায় কাজ করতো, যখন ঘরোয়াতে খেলতাম। ওই ব্যাপারটিই আমরা ওখান (ঘরোয়া) থেকে এখানে (আন্তর্জাতিক) নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। প্রথম ম্যাচটায় এমন একটা শুরু পাওয়া এবং দলের জন্য যা দরকার ছিল, সেখানে আমার কাজটা করতে পেরে ভালো লাগছে। চেষ্টা করব পরের ম্যাচগুলোতে যেন এরকম চালিয়ে যেতে পারি।’

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে গত কয়েক মৌসুমে যে ধরনের উইকেটে খেলা হয়েছে, সেটির কথা উল্লেখ করতেও ভুললেন না ৩০ বছর বয়সী ক্রিকেটার,‘ ঘরোয়াতে আমরা যেখানেই খেলি না কেন এবং যে সংস্করণেই খেলি, উইকেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

যদি আমরা ভালো উইকেটগুলোতে খেলতে পারি, তাহলে ব্যাটসম্যান যারা আছে এবং বাংলাদেশে ওই ধরনের ক্রিকেটার অনেক আছে, হয়তোবা উইকেটে ভরসা করতে পারে না বলে অনেক ধরনের শটস খেলতে পারে না। একটা ব্যাটসম্যান যখন ওই শটগুলো খেলা বন্ধ করে, তখন আস্তে আস্তে তার শটসের রেঞ্জও কমে যায়। ভালো উইকেটগুলোতে খেলতে থাকলে আমার কাছে মনে হয় যে, খুবই চান্স থাকে তার শটগুলোর ওপর আস্থা রাখার এবং দিনশেষে ভালো একটা ফলাফল আশা করা যায়।”







Loading...
Loading...


খেলাধুলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy