
X
সংগৃহীত ছবি
বিশ্বকাপের জ্বর এখন তুঙ্গে, উত্তেজনার পারদ চড়ছে প্রতিটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে। ক্ষণগণনার পালা সাঙ্গ করে এসে গেল বহুল কাঙিক্ষত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ! আজ রাতে পর্দা উঠবে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১১জুন) দিবাগত রাত ১টায় মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে মাঠের লড়াই।
আগামী ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেট লাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনাল দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে এই ফুটবল মহাযজ্ঞের। আকার ও কলেবরে বিশ্বকাপের সর্ববৃহৎ আসর এটি। নতুন ফরম্যাটের সর্বকালের সবচেয়ে জটিল আসরও। সে যা-ই হোক, প্রায় দেড় মাস এই আনন্দযজ্ঞে মেতে থাকবে পুরো দুনিয়ার ফুটবলপ্রেমীরা।
ফুটবল বিশ্বকাপের জ্বর এখন তুঙ্গে, উত্তেজনার পারদ চড়ছে প্রতিটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে। চার বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে রাত পোহালেই ফুটবলের সবচেয়ে বড় মহাযজ্ঞ শুরু । চারদিকে এখন শুধু আলোচনা কে জিতবে বিশ্বকাপ, কে লিখবে নতুন ইতিহাস। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শকের চোখ এখন উত্তর আমেরিকায়।
আর এই বিশ্বকাপের উত্তাপের মাঝেই আয়োজক মেক্সিকোকে সামাল দিতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিতে হচ্ছে। উদ্বোধনী ম্যাচকে সামনে রেখে সম্ভাব্য যানজট ও জনসমাগম সামাল দিতে আগেভাগেই বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে শহর কর্তৃপক্ষ। প্রথম দিনের চাপ সামাল দিতে রাজধানীর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি কর্মীদের বড় একটি অংশকে বাসা থেকে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণটাও স্বাভাবিক। এদিন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো সমর্থক, পর্যটক, সাংবাদিক, ফিফা কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে শহরজুড়ে ব্যাপক চাপ তৈরি হবে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সেদিন মেক্সিকো সিটির সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। কিন্ডারগার্টেন, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়—সব পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হবে। এই নির্দেশনা সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য। যার ফলে রাজধানীর রাস্তায় হাজারো স্কুলবাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ কমে যাবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ। এতে করে বিশ্বকাপ শুরুর দিনে শহরের পরিবহন ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।
আর সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ঘিরে প্রস্তুতির প্রতিটি পদক্ষেপই এখন এক নতুন ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠছে। প্রথম ম্যাচই গড়াবে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামে ১১ জুন রাত ১টায়। স্বাগতিকদের প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক স্তাদিও আজতেকায় ম্যাচটি মাঠে গড়াবে। এই ম্যাচ দিয়েই পর্দা উঠবে আসরের। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচটি ফিরিয়ে আনছে ২০১০ সালের স্মৃতিও। সেবারও দক্ষিণ আফ্রিকা খেলেছিল উদ্বোধনী ম্যাচে।
তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই আসরকে ঘিরে ইতোমধ্যেই উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে পুরো মেক্সিকো জুড়ে।
ফুটবল বিশ্বকাপের টিকিটের চড়া মূল্য নিয়ে ক্ষোভ, আমেরিকার অস্বস্তিকর রাজনৈতিক পরিবেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ছায়াকে ছাপিয়ে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই মহাযজ্ঞের চিরন্তন আবেদনই জয়ী হবে বলে প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার। উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা পসরা সাজিয়ে বসেছে ৪৮ দলের প্রথম বিশ্বকাপের। কলেবরের সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে বাড়তি একটি রাউন্ড—শেষ বত্রিশ। চ্যাম্পিয়ন হতে হলে তাই এবার একটি ম্যাচ বেশি (আটটি) খেলতে হবে।
তিন স্বাগতিক দেশের তিনটি ভিন্ন মাঠে আলাদাভাবে হবে তিনটি ভিন্ন উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে আসরের মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি হবে মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামেই। এখানেই পারফরম করবেন শাকিরা-জে বালভিনরা। ২০২৬ সালের ফুটবল মহাযজ্ঞকে ‘পৃথিবীর বুকে দেখা এযাবৎকালের সেরা শো’ বলে প্রচারণা চালাচ্ছেন স্বয়ং ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
গতবারের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বাংলাদেশ সময় রবিবার ভোরে হেক্সার মিশন শুরু হবে ব্রাজিলের। ষষ্ঠ বিশ্বকাপ স্বপ্নে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশন নেইমারদের দায়িত্ব দিয়েছে এক ইতালিয়ানকে। কার্লো আনচেলোত্তির পরশে কি দুই যুগের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবার বিশ্বজয়ের উৎসবে মাতোয়ারা হবে সেলেসাওরা? নাকি আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এনে দিয়ে সর্বকালের সেরার লড়াইয়ে নিজেকে আরো উঁচুতে তুলে ধরবেন ৩৮ বছরের লিওনেল মেসি।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আগামী বুধবার বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশন শুরু করবে লিওনেল স্কালোনির দল। বিশ্বকাপটা এখনো সোনার হরিণ হয়ে আছে প্রজন্মের অন্যতম সেরা তারকা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর কাছে। বয়সকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো সোনালি প্রজন্মের একঝাঁক সারথিকে নিয়ে সিআরসেভেনও চাইবেন নিজের শেষ আসরটা শিরোপার আবিরে রাঙাতে! ইংলিশদের ৬০ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানের স্বপ্ন বুকে লালন করে দেশ ছেড়েছেন হ্যারি কেইনরা। শিরোপা পুনরুদ্ধারের স্বপ্নে বিভোর ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানিও। সময়ই বলবে শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে বিশ্বকাপ।
২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিটের আকাশচুম্বী দাম নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে বিশ্বজুড়ে, যা সামাল দিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে ফিফা সভাপতিকে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের সবচেয়ে দামি টিকিটের দাম ছিল এক হাজার ৬০০ ডলার। অথচ এই আসরে সবচেয়ে ব্যয়বহুল টিকিটের দাম তিন হাজার ৩০০ ডলার। ব্যাপক চাহিদা থাকার পর টিকিটের চড়া দামের কারণে পুনর্বিক্রয় মার্কেটে এখনো অনেক ম্যাচের টিকিট অবিক্রীত পড়ে আছে! হু হু করে বেড়েছে হোটেল ও বিমানভাড়াও। খরচ সামলাতে তাই ত্রাহি অবস্থা ভক্ত-সমর্থকদের। অবশ্য নিজ দলের বিজয়ানন্দে উধাও হয়ে যাবে সব ঝক্কি-ঝামেলা! তবে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্বকাপের আনন্দ উৎসব মাটি করে দেবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েই গেছে। অভিবাসন, বিক্ষোভ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের দমন-পীড়নের কারণে এই বিশ্বকাপ পরিণত হতে পারে ‘বর্জন ও ভয়ের’।
গত সোমবার ফিফা একজন সোমালিয়ান রেফারিকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ায় আরও ঘনীভূত হয়েছে এমন আশঙ্কা। উমর আরতান নামের সোমালিয়ান এই রেফারির বৈশ্বিক এই আসরে ম্যাচ পরিচালনার কথা ছিল। কিন্তু গত শনিবার মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছার পর ফিরিয়ে দেওয়া হয় তাকে। ইরানি দলকে নিয়ে ঘটনাপ্রবাহও বড় কালো দাগ ফেলেছে টুর্নামেন্টের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খেলোয়াড়দের জীবন ও নিরাপত্তার স্বার্থে টুর্নামেন্ট থেকে ইরানকে নাম প্রত্যাহারের কথা বলে পরে নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ান। ইরান এরই মধ্যে তাদের বেইস ক্যাম্প স্থানান্তর করেছে মেক্সিকোতে। সেখান থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তিনটি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খেলতে হবে ইরানিদের। খেলোয়াড়দের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বিধি-নিষেধ না থাকলেও দলের ১৫ জন কর্মকর্তাকে ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র।
আর এই আসরে দেখা মিলবে কিছু নতুনত্বেরও। বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো প্রতি অর্ধে থাকছে কুলিং ব্রেক। এ ছাড়া ১০ সেকেন্ডের মধ্যে খেলোয়াড় বদল সম্পন্ন করা, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গে বিতর্কের সময় মুখ ঢেকে কথা বলায় থাকছে লাল কার্ডের ঝুঁকি। এই নতুনত্ব আর বির্তক সঙ্গী করেই পর্দা উঠছে ফুটবল মহাযজ্ঞের।